আফগানিস্তানের ৭০ ভাগ এলাকায় তালেবান  

আফগানিস্তানের ৭০ ভাগ এলাকায় তালেবান  

‘আমি যখন বাড়ি থেকে বের হই তখন আমি ভাবি, আর বাড়ি ফিরতে পারব কি না। বোমা হামলা, সন্ত্রাস আর তালেবানের বাড়-বাড়ন্ত আমাদের জীবনের একটা অংশ হয়ে গেছে।’

আফগানিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা সিংদাদের এই ব্যক্তির কথা থেকেই বোঝা যায়, তালেবানের কতটা ভয়াবহ উপস্থিতি রয়েছে দেশটিতে।

গতকাল মঙ্গলবার ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি প্রকাশিত এক গবেষণা থেকে জানা যায়, আফগানিস্তানের শতকরা ৭০ ভাগ এলাকায় রয়েছে তালেবানের সক্রিয় অবস্থান। এর মধ্যে শতকরা ৪ ভাগ এলাকা সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যেখানে সরকারি বাহিনী বা সরকারের কোনো নির্দেশ চলে না। বাকি ৬৬ ভাগ এলাকায়ও রয়েছে তাদের প্রকাশ্য উপস্থিতি।

আফগান সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে মাত্র ১২২টি জেলা, অর্থাৎ মাত্র ৩০ ভাগ এলাকা রয়েছে, যেখানে তালেবানের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তবে এর মানে এই নয় যে, সেখানে তাদের উপস্থিতি নেই। ওই ৩০ ভাগ এলাকায়ও তালেবানের হামলার ঘটনা ঘটছে।

গবেষণাটিতে দেশটির ৩০টি জেলায় জঙ্গিগোষ্ঠী তথাকথিত ইসলামিক স্টেটের (আইএস) উপস্থিতি আছে বলেও জানানো হয়। তবে কোনো এলাকাই এখনো তাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে যায়নি।

বিবিসির এই গবেষণা নিয়ে আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির মুখপাত্র বক্তব্য দেন। দেশটির কিছু কিছু জায়গায় থাকলেও অধিকাংশ জায়গায় তালেবানের প্রভাব কমে গেছে বলে দাবি করেন তিনি। কিছু মানুষের একদিনের এক ঘণ্টার আলাপ থেকেই প্রভাবিত হয়ে বিবিসি এই গবেষণা করেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় বাহারাক জেলার স্থানীয় পরিবহন কোম্পানির কর্মকর্তা আমারুদ্দিন বলেন, ‘আমরা অবিরাম ভয়ের মধ্যে বসবাস করি। কখন সরকার আর তালেবানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, আর আমরা ক্রসফায়ারের শিকার হই। জীবনে আবারও অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। এখন শান্ত আছে, কিন্তু তালেবান আছে এখানে।’

এ নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ আফগানিস্তানের প্রায় প্রতিটি জেলার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি। এক হাজার ২০০ মানুষের সঙ্গে কথা বলে গবেষণাটি করা হয়, যা সম্প্রতি তালেবানের উপস্থিতি নিয়ে ন্যাটোর করা বিবৃতির চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য বলা যায়।

ন্যাটোর করা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আফগানিস্তানের মাত্র ৪৪ ভাগ এলাকায় তালেবানের উপস্থিতি ছিল।

গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরেই উপর্যুপরি হামলা, সংঘর্ষের ঘটনায় ঘুরপাক খাচ্ছে আফগানিস্তান। এর মধ্যে শহরের কেন্দ্রে একটি অ্যাম্বুলেন্স বোমা হামলায় একশর বেশি এবং রাজধানী কাবুলের একটি হোটেলে হামলায় ২০ জন নিহত হন।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ‘কাবুল এবং অন্যান্য বড় শহরে বড় হামলাগুলো হচ্ছে। কিছু হামলা করা হয়েছে পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো থেকে বা গুপ্তঘাতকদের মাধ্যমে।’

আমেরিকার প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রধান কার্যালয় পেন্টাগন সরাসরি বিবিসির এই গবেষণা নিয়ে কোনো মন্তব্য না করলেও আফগানিস্তানের ৫৬ ভাগ এলাকা সরকারের নিয়ন্ত্রণে—ন্যাটোর এমন প্রতিবেদনের কথাই উল্লেখ করেছেন।

বর্তমানে দেশটির অন্য সব সাধারণ মানুষের মতো শিশুরাও প্রতিনিয়ত সহিংসতার শিকার হচ্ছে। ভয়ে অনেককে স্কুলে যেতে দেন না অভিভাবকরা। শিশুদের জীবন কাটছে অনেকটা গৃহবন্দি হয়েই।

কাবুলের কার্পেট বিক্রেতা ও ১৩ সন্তানের জনক পালোয়ান বলেন, ‘আমার বাচ্চারা বাড়ির বাইরে নিরাপদ না। তাই আমি তাদের বাইরে যেতে দিই না। তারা মূলত গৃহবন্দি। আমি তাদের আমার গুদামে একটা বিদ্যালয় করে দিয়েছি। দেয়াল আর কার্পেটই তাদের জীবন। কাবুলে বসবাস করেও মনে হয় যেন জঙ্গলে বসবাস করি।’