কুড়িগ্রাম-৩ আসনে আ.লীগÑবিএনপি’তে একাধিক প্রার্থী জাপায় অস্বস্তি

কুড়িগ্রাম-৩ আসনে আ.লীগÑবিএনপি’তে একাধিক প্রার্থী জাপায় অস্বস্তি

মোঃ নূরবক্ত মিঞা, উলিপুর (কুড়িগ্রাম) থেকে ॥ কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার সঙ্গে চিলমারি উপজেলার ৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত কুড়িগ্রাম-৩ সংসদীয় আসন। জাতীয় সংসদের ২৭ নম্বর এই আসনটির জাতীয় পার্টির বর্তমান সংসদ সদস্য এ কে এম মাঈদুল ইসলাম। বিগত দু’টি সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এ আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছিল। কিন্তু জাতীয় পার্ঠির সঙ্গে একবার মহাজোট এবং পরের বার সমোঝোতা করার কারণে আসনটি ছেড়ে দিতে হয়। তবে আগামী সংসদ নির্বাচনে আসনটি ছেড়ে দিতে নারাজ স্থানীয় আওযামী লীঘ। এ ব্যাপারে  দলের নেতারা কেন্দ্রে জোড় লবিং করছেন।
অন্যদিকে বিরোধীদল জাতীয় পার্টির বর্তমান সংসদ সদস্য একেএম মাঈদুল ইসলামের ভাবমূর্তি আগের মতো নেই। মনোনয়ন নিয়ে প্রতিদ্বন্দিতার আভাসও পাওয়া যাচ্ছে। আবারও তিনি জাতীয় পার্টির মনোনয়ন পাবেন বলে অনুসারীদের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। তবে মনোনয়ন আলোচনায় রয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবু তাহের খায়রুল হক এটি। তবে সৌদিপ্রবাসী আবু তাহের গ্রুপিংয়ের রাজনীতিতে মাঈদুল ইসলামকে বিভিন্ন সময় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেও দলের মনোনয়ন পাবেন কি না তা নিশ্চত নয়। জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে উলিপুর উপজেলা জাতীয় পার্টিতে বিরোধ চলে আসছে। পাল্লা-পাল্টি কমিটি ও আলাদা কার্যালয় করার কারণে সাংগঠনিক কর্মকান্ড মূখ থুবড়ে পড়েছে। সাংসদ সদস্য মাঈদুল ইসলামের এলাকায় কম আসা, বিশেষ করে ভয়াবহ বন্যায় তিনি এলাকায় না এসে প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ করে সমালোচিত হয়েছেন। এ ছাড়া টেস্ট রিলিফ (টিআর), কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) কর্মসূচি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লোকবল নিয়োগে সংসদ সদস্যের হয়ে কাজ করেন তাঁর ভাই শফিকুল ইসলাম দারা। এসব কাজে দারার বিরুদ্ধে রয়েছে নানান অভিযোগ, যা পরোক্ষভাবে মাঈদুল ইসলামের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলে। দলের নেতাকর্মীরা জানান, জাতীয় পার্টি এককভাবে নির্বাচন করলে ভোটের মাঠে মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য ফ্যাক্টর হতে পানবে না। এটা বুঝতে পেরে মাঈদুল ইসলাম মহাজোটের মাধ্যমে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার চেষ্টায় আছেন।
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করার বিষয়টি নিশ্চত করে কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য একেএম মাঈদুল ইসলাম বলেন, জোট-মহাজোট যাই হোক আমি নির্বাচন করব। কুড়িগ্রামের জন্য আমি যত উন্নয়ন করেছি, আর কে করেছে ? তাই মনোনয়ন নিয়ে কোন চিন্তা করি না।  এলাকায় কম আসা জনসংযোগে ভাটা প্রসঙ্গে তিনি বলেন,। অনেকদিন অসুস্থ্য ছিলাম, তাই এলাকায় যেতে পারিনি, তবে এলাকার নেতা-কর্মী ও জনসাধারণের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।
এদিকে সনিক প্রাইম গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. আক্কাছ আলী জাতীয় পার্টি থেখে নির্বাচন করতে পারেনÑএমন আলোচনা শোনা যাচ্ছে। এলাকায় তাঁর জনপ্রিয়তা থাকলেও তিনি সির্ব্চান করবেন কি না, করলে কোন দলের মনোনয়ন নিবেনÑএ নিয়ে দ্বিধায় দিন কাটাচ্ছেন বলে জানা গেছে। তবে ইদানিং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সঙ্গে তাঁর সখ্য এবং বন্যার সময় এলাকায় ব্যাপক ত্রাণ তৎপরতার কারণে আলেঅচনায় এসেছেন তিনি। জানতে চাইলে ডা. আক্কাছ আলী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মানুষের সেবা করার কারণে মানুষের আকাঙ্খা যে আমি নির্বাচনে প্রার্থী হই। এরশাদ সাহেবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়েও অনেক ইতিবাচক কথা বলেন। তবে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিয়ে এখনো চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেইনি।
এদিকে সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম হাবিব দুলাল জাতীয় পার্টি ত্যাগ করে ‘ট্রুথ পার্টি’ নামে একটি দল গঠন করেছেন। গত নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মনোনয়নের ব্যাপারে আশাবাদী থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে হতাশ হতে হয়। তিনি এর আগে ২০০১ সালে কুড়িগ্রাম-৪ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি চিলমারী উজেলার অধিবাসী। আগে চিলমারী উপজেলা কুড়িগ্রাম-৪ আসনের অন্তর্ভূক্ত থাকলেও বর্তমানে জাতীয় সংসদের সীমানা পূলর্র্বিন্যাসের পর কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিলমারীর অধিকাংশ এলাকা। গোলাম হাবিব দুলাল কুড়িগ্রাম-৪ আসনে ২০০৮ সালে নির্বাচন করে হেরে যান। ২০০৯ সালে এরশাদের ছেড়ে দেওয়া কুড়িগ্রাম-২ আসনে উপ-নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বি করেও হেরে যান তিনি। বর্তমানে গোলাম হাবিব দুলাল ‘ট্রুথ পার্টি’ নামের নতুন দলের চেয়ারম্যান। কিছুদিন ধরে তাঁর বিলবোর্ড ও ব্যানার কুড়িগ্রাম-৩ নির্বাচনী এলাকায় দেখা যাচ্ছে। আগামী নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-৩ ছাড়াও তাঁর আগের আসন কুড়িগ্রাম-৪ এ প্রার্থী হতে পারেন বলে জানিয়েছেন তিনি। গোলাম হাবিব দুলাল বলেন, এরশাদ সাহেবের নীতি ও আদর্শের সঙ্গে একমত না হওয়ায় তাঁর দল ত্যাগ করেছি। নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ করে মানুষের ব্যাপক সাড়াও পাচ্ছি।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী হিসেবে উলিপুর উপজেলা শাখার সভাপতি মতি শিউলী, চিলমারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত আলী (বীরবিক্রম), উলিপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সদস্য ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি এম এ মতিন, সাবেক সংসদ সদস্য আমজাদ হোসেন তালুকদারের নাম শোনা যাচ্ছে। ২০০৮ সালে অধ্যক্ষ নাসিমা বানু ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে মতি শিউলী দলের মনোনয়ন পেলেও মহাজোটের কারণে ম্ঈদুল ইসলামকে আসনটি ছেড়ে দিতে হয়। এবারেও মতি শিউলী মনোনয়নের জন্য জোড় লবিং করছেন। তবে তাঁকে অন্যান্য প্রার্থীরা ছাড় দেবেন না বলে শোনা যাচ্ছে। আওয়ামীলীগে প্রকাশ্য কোন্দলে মাঝে-মধ্যেই সংঘাতের ঘটনাও ঘটছে। এমনকি জাতীয় শোক দিবসে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। বহিস্কৃত হয়েছে কয়েকজন। দুটি গ্রুপের একটি মতি শিউলী সমর্থক। মতি শিঊলী বলেন, আমাদের সরকার নারী ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী। আমি উলিপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সভাপতি, একমাত্র আমি নির্বাচনমূখী, তাই আশা করি মনোনয়ন আমিই পাব। দলের কোন্দল সম্পর্কে তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরোধীতা করার সুযোগ নেই। মনোনয়ন পেলে সবাই দলের প্রার্থীর পক্ষে একাট্টা হয়ে কাজ করবে। বারবার জাতীয় পার্টিকে আসনটি ছেড়ে দেয়ার কারণে নেতা-কর্মীদের ধরে রাখা কঠিন হয়ে গেছে। সরকারে থেকেও বিরোধী দলের মতো মনে হয়। তাই নেত্রীর কাছে আসনটি দাবী করা হবে।
চিলমারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত আলী (বীর বিক্রম) বলেন, নির্বাচনী এলাকায় আমার ব্যাপক পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে ছিলাম। মনোনয়ন পেলে আমার বিজয় সুনিশ্চিত।
এদিকে উলিপুরের রাজনীতিতে পরিচ্চন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী অধ্যক্ষ নাসিমা বানুর স্বামী অধ্যাপক এম এ মতিন এবার দলের মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট আশাবাদী। তিনি বলেন, মাঈদুল ইসলাম উলিপুরের উন্নয়নের প্রধান প্রতিবন্ধকতা। এই প্রতিবন্ধকতা অপসারণের জন্য উলিপুরবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তিনি জনপ্রতিনিধি হয়ে জনগণের হক নষ্ট করছেন। দাম্ভিকতা দেখিয়ে জনগণকে দাবিয়ে রেখে নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করছেন। তাই সুযোগ পেলে অসৎ ও অথব্ব নেতৃত্বকে হটিয়ে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই।
বিএনপি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি’র মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে দলের জেলা সভাপতি তাসভিরুল ইসলাম আলোচনায় রয়েছেন। এ ছাড়া ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল খালেক মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে জানা গেছে। তবে দলীয় সূত্রগুলো বলছে, তাসভিরুল ইসলামের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। উলিপুর উপজেলা ও পৌর নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী জয়লাভ করায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন তিনি। তাঁর আপন বড় ভাই ও বর্তমান সংসদ সদস্য মাঈদুল ইসলামের গণবিচ্ছিন্নতা তাঁর জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
বিএপি নেতা-কর্মীরা বলছে, মাঈদুল ইসলাম আবার মনোনয়ন পেলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা কতটা আন্তরিক হয়ে কাজ করবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাসভিরুল ইসলাম কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন। এ ছাড়া জামাত ও জাতীয় পার্টি বিরোধী কিছু ভোট তাঁর পক্ষে বলেও ধারণা করছে দলের নেতা-কর্মীরা।

মন্তব্য নেই

উত্তর