সিডরের দশ বছর কলাপাড়ার মানুষ ১০ বছরেও ভূলতে পারেনি ভয়াবহ সেই...

সিডরের দশ বছর কলাপাড়ার মানুষ ১০ বছরেও ভূলতে পারেনি ভয়াবহ সেই সিডরের তান্ডব

সোলায়মান পিন্টু,কলাপাড়া(পটুয়াখালী)প্রতিনিধি।। আজ ১৫ নভেম্বর। ২০০৭ সালের এই দিনেই উপকূলীয় এ জনপদে আঘাত হানে সুপার সাইক্লোন সিডর। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেল দশটি বছর। কিন্তু এ জনপদের মানুষ আজও ভূলতে পারেনি সেই ভয়াবহ দিনটির কথা। ভয়াবহ সুপার সাইক্লোন সিডর লন্ডভন্ড করে দিয়েছিল উপকূলীয় অঞ্চল পটুয়াখালীর কলাপাড়াকে। সিডরের আগ্রাসী থাবায় সেদিন অনেকেই হারিয়েছেন স্বজনদের। তারা কেউকেউ আজও পথ চেয়ে আছেন স্বামী, সন্তান, বাবা, মা কিংবা ভাই বোনের ফেরার অপেক্ষায়। সিডরের তান্ডবে সেদিন নিশ্চিহ হয়েছিল মাইলের পর মাইল বেড়িবাঁধ। যা আজও মেরামত কিংবা সংস্কার করা হয়নি স্থায়ী ভাবে। সামান্য জোয়ারেই প্লাবিত হয় উপকূলীয় এ অঞ্চলের ফসলী জমি। ফলে সেদিনের সেই দূর্ভোগ এখনও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে এখানকার মানুষদের।
দিনটি ছিলো বৃহস্পতিবার। সন্ধ্যা ৬টার দিকে দমকা হাওয়ার সাথে শুরু হয় গুড়িগুড়ি বৃষ্টি । আবহাওয়া অফিস ৫নম্বর বিপদ সংকেতের পর ০৮ নম্বর মহা বিপদ সংকেত দিলেও উপকূলীয় এলাকার অনেকেই বুঝতে পারেনি এভাবে লন্ড ভন্ড হয়ে যাবে সবকিছু। রাত ১১টার দিকে প্রচন্ড বেগে আঘাত হানে কলাপাড়া উপজেলায়। মাত্র কয়েক মিনিটে ১০ থেকে ১২ ফুট সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়ে যায় বিস্তীর্ন এলাকা। মনে হয়েছে যেন বঙ্গোপসাগরের সব পানি যমদূত হয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সবকিছু। নিমেষেই উড়ে যায় ঘর-বাড়ি, গাছ-পালা। মাটির সঙ্গে মিশে যায় বহু স্থাপনা, রাস্তাঘাট, পশু-পাখি, জীবজন্তুু । বিধ্বস্ত হয় বেঁড়িবাধ। আহত হয় হাজার হাজার মানুষ। প্রান হারায় উপজেলার ৯৪ জন মানুষ। প্রকৃতির নিষ্ঠুর আঘাতে সে রাত তছনছ করে দেয় অনেকের সাজানো সংসার । অনেকের লালিত স্বপ্ন। প্রকৃতি যে মানুষের ওপর এতটা নিষ্ঠুর আচরন করতে পারে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডর তার উৎকৃষ্ট উদাহরন। কোনদিন ওই স্মৃতির কথা ভুলতে পারবেনা উপকূলীয় এলাকার ক্ষতিগ্রস্থ হাজারো মানুষ।
সরকারী ও বে-সরকারী সংস্থার পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, সিডরে কলাপাড়া উপজেলায় ৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে এক হাজার ৭৮ জন। এর মধ্যে প্রতিবন্ধী হয়েছে ৯৬ জন। স্বামী হারা হয়েছে ১২ নারী। এতিম হয়েছে ২০ জন শিশু। নিখোঁজ হয়েছে সাত জেলে। এই উপজেলার মৃত গবাদি পশুর সংখ্যা চার হাজার নয়শত ৪৪টি। ক্ষতি হয়েছে পাঁচশত ৫৩টি নৌযানের। সম্পূর্ণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ১২ হাজার নয়শত ৭০টি পরিবার। আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সংখ্যা ১৪ হাজার নয়শত ২৫টি।স্বজন হারাদের কাছে তাদের খোঁজখবর নিতে গেলে বারবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। নিখোঁজ থাকা স্বজনের ফেরার অপেক্ষায় আজও পথ চেয়ে বসে আছেন তারা। কিছুতেই তারা সেদিনের সেই বিভিষিকাময় দিনটির কথা ভুলতে পারবেনা।
নীলগঞ্জ ইউনিয়নের পূর্ব সোনাতলা গ্রামের সোয়াইব পন্ডিতের দুই মেয়ে লুৎফুল নেছা ও রিয়া মনি সুপার সাইক্লোন সিডরে নিহত হয়। তার স্ত্রী তাসলিমা বেগম একই সাথে দুই মেয়ে হারিয়ে সে এখন পাগল প্রায়। সে দিনের কথা তার কাছে জানতে চাইলে বার বার তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
মহিপুর ইউনিয়নের নিজামপুর গ্রামের বিধ্বস্ত বাঁধ লাগোয়া বসবাসরত গৃহিনী আলেয়া বেগম বলেন, আবহাওয়ার সিগন্যাল দিলে আমাদের দুশ্চিন্তার শেষ থাকে না। এই বুঝি পানিতে তলিয়ে গেলাম।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সিডরের পরবর্তিতে যেসব বাঁধ মেমারমত করা হয়েছে সেগুলোর অবস্থা নাজুক। ইতোমধ্যে মহিপুর, লালুয়া ও দেবপুর ইউনিয়নের বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁেধর বেশ কয়েকটি পয়েন্ট জোয়ারের পানির তান্ডবে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। অমাবস্যা-পূর্নিমায় বিধ্বস্ত বাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে এখনো গ্রামের পর গ্রাম তলিয়ে থাকে।
এছাড়া সিডরে ক্ষতিগ্রস্থদের পূর্নবাসনের জন্য বিভিন্ন সাহায্যকারী সংস্থা যে ঘর বা আবাসন পল্লী নির্মান করে দিয়েছিল তার অধিকাংশ ঘরের এখন বেহাল দশা। বসবাসের অনুপযোগী হওয়ায় তাদের ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আবুল খায়ের বলেন, ইতোমধ্যে পাঁচ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সংস্কারের জন্য টেন্ডার সস্পন্ন হয়েছে। যেকোন সময় বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধের কাজ শুরু হবে বলে তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো.তানভীর রহমান জানান, সিডর পরবর্তি সময় ক্ষতিগ্রস্থদের পর্যায়ক্রমে বিভিন্নভাবে সহায়তা দেয়া হয়েছে। ওইসব ক্ষতিগ্রস্তদের বসবাস উপযোগী করার জন্য উপজেলা পরিষদ থেকে সহযোগীতা অব্যাহত থাকবে।

মন্তব্য নেই

উত্তর