উন্নয়নশীল দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ

উন্নয়নশীল দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ

অবশেষে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের (ডেভলপিং কান্ট্রি) কাতারে যুক্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ; বিশ্বে পেতে যাচ্ছে নতুন পরিচিতি। অর্থনীতি ও সামাজিকভাবে এই ২০১৮ সালের মার্চে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি।

উন্নয়নশীল দেশ বা ‘ডেভলপিং কান্ট্রি’ হতে যে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়, বাংলাদেশ তা অর্জন করেছে। জাতিসংঘের মূল্যায়নের ভিত্তিতে নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষে এ ঘোষণা অবশ্য কার্যকর হবে ২০২৪ সালে।

 

বিশ্বের ইকোনমিক ও সোশ্যাল কাউন্সিল তিনটি বিষয় বিবেচনা করে বাংলাদেশকে এ ঘোষণা দেবে, যা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এটি হবে একটি বড় অর্জন। তবে মধ্যবর্তী এ সময়ে বাংলাদেশের এই অর্জন বা অগ্রগতি ধরে রাখতে হবে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, উন্নয়নকে টেকসই করতে মাথাপিছু আয়ের পাশাপাশি সামাজিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রতি তিন বছর পর পর সূচক তৈরি করে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। তারই ভিত্তিতে বিশ্বের দেশগুলোকে ‘স্বল্পোন্নত দেশ’, ‘উন্নয়নশীল দেশ’ ও ‘উন্নত দেশ’— এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়।

বিবেচনার সব সূচক অর্জন করেই দ্বিতীয় ধাপে পা রাখছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সামাজিক গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে সিডিপির ২০১৮ সালের মূল্যায়নে বাংলাদেশের এলডিসির তালিকা বের হওয়ার যোগ্যতা অর্জন এখন প্রায় নিশ্চিত। সিডিপির ২০১৫ সালের মূল্যায়নে দেখা গেছে, উন্নয়নশীল দেশ হতে অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচকে ৩২ পয়েন্ট বা তার নিচে থাকতে হয়। এ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ২৫ দশমিক ১ পয়েন্টে। মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকে ৬৬ বা এর বেশি পয়েন্ট পেতে হয়। এ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৬৩ দশমিক ৮ পয়েন্টে। আর মাথাপিছু আয় হতে হয় এক হাজার ২৪২ মার্কিন ডলার। অ্যাটলাস পদ্ধতিতে করা বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল ৯২৩ ডলার।

তবে ২০১৮ সালে জাতিসংঘের সিডিপির সঙ্গে সরকারের বৈঠকে দেওয়া তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৮ সালে মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অর্জিত পয়েন্ট হবে ৭২ দশমিক ৮। অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচক নেমে দাঁড়িয়েছে ২৫ পয়েন্টে। আর মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে এক হাজার ২৭২ ডলারে। সে অনুযায়ী তিন সূচকেই উত্তীর্ণ হচ্ছে বাংলাদেশ।

তবে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “এই ২০১৮ সালের মার্চে এলডিসি থেকে ‘ডেভলপিং কান্ট্রি’তে পরিণত হবে বাংলাদেশ। ‘ডেভলপিং কান্ট্রি’ হতে যে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয় তা বাংলাদেশ অর্জন করেছে।”

তোফায়েল আহমেদ বলেন,‘জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কাউন্সিলের মূল্যায়ন কমিটির সভা এ মাসেই অনুষ্ঠিত হবে। সেখানেই ডেভলপিং কান্ট্রি হিসেবে ঘোষণার বিষয়টি আলোচিত হবে। আশা করা যায়, এই কাউন্সিল যথাযথ ঘোষণাই দেবে। এ ঘোষণা কার্যকর হতে প্রস্তুতির সময় থাকবে। সেই সময় নিয়েই বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি সূবর্ণজয়ন্তীতে ২০২১ সালে বিশ্বে উন্নয়নশীল দেশের পরিচয়ে পরিচিতি পাবে বাংলাদেশ।’

জানা গেছে,উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ স্বীকৃতি পেলেও বৈশ্বিক সম্প্রদায় আগামী ১৫ বছর বাংলাদেশের এই উত্তরণকে খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। বাংলাদেশের এই উত্তরণ হবে একমুখী প্রক্রিয়া। কেননা, ধারণাগতভাবে উত্তরণের পর আবার এলডিসিতে ফিরে যাওয়া সম্ভব হলেও যেসব দেশের জনসংখ্যা সাড়ে সাত কোটির বেশি, সেসব দেশের জন্য তা প্রযোজ্য নয়। তাই বাংলাদেশের আর পিছু ফেরার সুযোগ নেই।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) করা ভবিষ্যদ্বাণী হলো— ২০১৮ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গতি আসবে। যথাযথ প্রস্তুতি নিলে বাংলাদেশ তার সুফল নিতে পারবে।

বাংলাদেশের এই অর্জনে এখন করণীয় কী জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি)ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জনের জন্য আমাদের প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এখনও বাংলাদেশের তিন কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। আমাদের অর্থনীতি এখনও পুরোপুরি শিল্পায়িত হয়নি। এই পরিপ্রেক্ষিতে রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণের পাশাপাশি আমাদের পরিস্থিতিনির্ভর অর্থনীতি থেকে উৎপাদনশীলতা নির্ভর অর্থনীতির দিকে যেতে হবে। তাই এই উত্তরণের মধ্য দিয়েই সব সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।’

তিনি জানান, ব্যবসায় পরিবেশ সক্ষমতা, বন্দর সক্ষমতাও বাড়াতে হবে অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ, যাতে শুল্কমুক্ত সুবিধা না পেলেও পণ্যের দাম ঠিক রেখে বাজার প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা ধরে রাখা যায়। এ ছাড়া আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়াতে এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে এই উত্তরণ প্রক্রিয়া শুরু হলেও ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের বাণিজ্য সুবিধা পাবে।