চট্টগ্রাম-১ আসনে আ.লীগ প্রার্থীর বিরামহীন প্রচারণা, মাঠে নেই বিএনপি

মুহাম্মদ দিদারুল আলম,চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনে উজ্জীবিত আওয়ামীলীগ আর গ্রেপ্তার আতঙ্কে বিএনপি। নির্বাচনে মোট ৬ জন প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্ধিতা হবে আ’লীগের হেবিওয়েট প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সাথে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিনের। নির্বাচনে বিরামহীন প্রচারণা করছেন আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। কাকডাকা ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত গনসংযোগের পাশাপাশি নেতাকর্মীদের নির্বাচন উপলক্ষে দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন তিনি।

এদিকে প্রতীক বরাদ্ধ পাওয়ার পরও প্রকাশ্যে এখনো গনসংযোগে দেখা যায়নি বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নুরুল আমিনকে। উপজেলা জুড়ে নৌকা প্রতীকের সমর্থনে মাইকিং, পোস্টার, ব্যানার, তৌরণ চোখে পড়লেও দেখা যায়নি ধানের শীষ প্রতীকের কোন প্রচারণা সামগ্রী।

আগামী ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বিরামহীন নির্বাচনী প্রচারণা করছেন। তিনি প্রত্যেকদিন কেন্দ্র কমিটির মিটিং, গণসংযোগ, নির্বাচনী জনসভা, নির্বাচনী ইশতেহার সংবলিত লিপলেট বিতরণ কর্মসূচীতে অংশ নিচ্ছেন। ইতমধ্যে উপজেলার সব ইউনিয়নে গণসংযোগ, কেন্দ্র কমিটি গঠন, তৃণমূল নেতাকর্মীদের নিয়ে বর্ধিত সভা, জনসভা সহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করেছে আওয়ামীলীগ। যেখানে আওয়ামীলীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা গেছে। নির্বাচনে আ’লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা স্ব স্ব ওয়ার্ডে নৌকা প্রতীকের সমর্থনে গণসংযোগ করছেন প্রতিদিন। এদিকে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছাড়াও নৌকা প্রতীকের সমর্থনে তার স্ত্রী, ছেলে, পুত্রবধু সহ পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন গ্রামে গনসংযোগ করছেন।

জানা গেছে, মিরসরাইয়ের বর্তমান সংসদ সদস্য বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এর আগেও ৫ বার সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে তিনি সর্বপ্রথম তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর তিনি ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৮ সালে এবং গত ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি স্বাধীণতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর-১ এর সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদে তিনি বিরোধী দলীয় হুইপের এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি জাতীয় সংসদে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। রাজনীতিতে আসার পর তিনি দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহবায়কের দায়িত্ব¡ পালন করেন। এছাড়া ১৯৮০ ও ৮৪ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৯২, ১৯৯৬, ২০০৪ এবং ২০১২ সালে সভাপতি এবং একই সাথে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি বিএনপি প্রার্থী প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরীকে সাড়ে ১০ হাজার ভোটে পরাজিত করেন। সর্বশেষ ২০১৪ সালের নির্বাচনে মিরসরাই থেকে বিনাপতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন। বর্তমানে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং সরকারের গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার স্বপ্নদ্রষ্টা বলা হয় তাকে।

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি বলেন, আমি ৬বার মিরসরাই আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। আমার চেয়ে কেউ বেশী মিরসরাইতে উন্নয়ন কর্মকান্ড করতে পারেনি। মিরসরাইয়ের ১৬টি ইউনিয়ন ও দু’টি পৌরসভার কোন গ্রাম বাকী নেই যেখানে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। মিরসরাইয়ের জনগণ সর্বমোট ৫লাখ হবে। আমি মিরসরাইয়ের ইছাখালী অঞ্চলে অর্থনৈতিক অঞ্চর প্রতিষ্ঠার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনুরোধ করি। তিনি আমার অনুরোধ রেখেছেন। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ২০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে। প্রধানমন্ত্রী আমাকে ওয়াদা দিয়েছেন অর্থনৈতিক অঞ্চলে সর্বপ্রথম মিরসরাইয়ের মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এতে করে মিরসরাইয়ে তরুণ প্রজন্মের পাশাপাশি বেকারদের আর কর্মসংস্থানের অভাব হবে না। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে মানুষ এখানে কাজ করতে আসবে। তখন মিরসরাই হবে সিঙ্গাপুর এবং মালেশিয়ার চাইতেও উন্নত রাষ্ট্র।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের কোন উপজেলায় দু’টি পৌরসভা নেই। আমি মিরসরাইতে ২টি পৌরসভা ও ২টি থানা করেছি। মিরসরাইয়ের সুফিয়া রোড এলাকায় ও সোনাপাহাড় এলাকায় গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে আবাসন প্লট করতেছি। মিরসরাই বেসিক শিল্প নগরী স্থাপন, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃত্রিম লেক মহামায়া সেচ সম্প্রসার প্রকল্পের উদ্বোধন, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের উদ্যোগে মিরসরাই উপজেলার উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন (এম.ইউ.ডি.পি) কার্যক্রম শুরু করা, গ্রামীণ সড়কের উন্নয়ন, নিজামপুর কলেজ ও মিরসরাই পাইলট স্কুলকে সরকারীকরণ, মিরসরাই লতিফীয়া মাদ্রাসাকে কামিলে উন্নীতকরণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নতুন ভবন নির্মাণ সহ প্রত্যেকটি সেক্টরে উন্নয়ন কার্যক্রম করেছি। ইতেমধ্যে মিরসরাইয়ের প্রায় শতভাগ বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা করেছি।

এদিকে নির্বাচনী প্রচারণায় আওয়ামীলীগ উজ্জীবিত থাকলেও একেবারে নীরব ভূমিকায় রয়েছেন বিএনপি প্রার্থী নুরুল আমিন ও তার সমর্থকরা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে পূর্বের অভিজ্ঞতা না থাকলেও তিনি গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে উপজেলা চেয়াম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন। নুরুল আমিন ১৯৯৮ সালে উপজেলার ৫ নম্বর ওসমানপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০০৩-২০১১ পর্যন্ত ওসমানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৮-২০১২ পর্যন্ত ওসমানপুর ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি ২০০৯ সালে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক ও একই বছর কাউন্সিলের মাধ্যমে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০১০ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপি’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি দীর্ঘদিন মিরসরাই উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের সাথে তার রয়েছে নিবীড় যোগাযোগ। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য থেকে শুরু করে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দৌড়ে বিএনপির এই নেতা। দলীয় মনোনয়ন দৌড়ে অনেক প্রার্থী থাকলেও শেষ পর্যন্ত ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন পান তিনি।

নুরুল আমিন বলেন, উপজেলা বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের মধ্যে থাকা সকল মতানৈক্য নিরসনে আমি সব পক্ষের সাথে বৈঠক করেছি। ধানের শীষ প্রতীককে বিজয়ী করতে জাতীয়তাবাদী আদর্শের সকল শক্তিকে সাথে নিয়ে শীঘ্রই আমরা মাঠে নামবো। ইতমধ্যে কয়েকটি ইউনিয়নে গনসংযোগ করেছি। যেখানে গণসংযোগ করেছি সেখানে জনগণের অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছি। নির্বাচনে প্রশাসন নিরপেক্ষ ভাবে দায়িত্ব পালন করলে মিরসরাইতে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত। তিনি আরো বলেন, আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের হামলা এবং পুলিশের গ্রেপ্তার আতঙ্কে গনসংযোগে বিএনপি নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে আসতেছেনা। যেখানে বিএনপি নেতাকর্মীরা গণসংযোগ করছে সেখানে আ’লীগ হামলা করছে। পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করতে বাড়িতে বাড়িতে অভিযান চালাচ্ছে। ইতমধ্যে উপজেলার অনেকে সিনিয়র নেতাসহ অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। যারা আমার নির্বাচনী কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলো।

মিরসরাই আসনে বিভিন্ন দলের আরো ৪জন প্রার্থী নির্বাচন করছেন। তারা হলেন গনফোরাম মনোনীত প্রার্থী নুর উদ্দিন (উদীয়মান সূর্য), ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ প্রার্থী মোঃ আবদুল মান্নান (চেয়ার), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী মোঃ শাসছুদ্দিন (হাতপাখা), বাংলাদেশ মুসলিমলীগ মনোনীত প্রার্থী শেখ জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী (হাত)। নির্বাচনী মাঠে নুর উদ্দিন এবং শেখ জুলফিকার বুলবুলের উপস্থিতি ও প্রচারণা সামগ্রী দেখা না গেলেও মোঃ আবদুল মান্নান, মোঃ শাসছুদ্দিন কে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী প্রচারণায় দেখা গেছে।

আসন পরিচিতি : জাতীয় সংসদের ২৭৮ নং আসনের চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আয়তন ৪’শ ৮২.৮৮ বর্গ কি.মি। মিরসরাই উপজেলা ১৬টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। প্রায় ৬ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে মোট ভোটার ৩লাখ ১৫ হাজার ৬ জন। যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৯ হাজার ৫’শ ৪২ জন আর নারী ভোটার ১লাখ ৫৫ হাজার ৪’শ ৭৪ জন। মোট ১’শ ৪টি ভোট কেন্দ্রে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন ভোটাররা। মিরসরাইতে নির্মাণ করা হচ্ছে এশিয়ার বৃহত্তম শিল্প পার্ক মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল। পূর্বে পাহাড় আর পশ্চিমে সমুদ্র। দেশের লাইফ লাইনখ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ২৮ কিলোমিটার অংশ পড়েছে মিরসরাইতে। তাছাড়া ভারতের আসাম, ত্রিপুরা সহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের সামীনা পড়েছে মিরসরাইয়ের পাশে।

সক/তৌহিদ