রেলের নতুন ২৫০ কোচ আসতে শুরু করবে চলতি মাসেই

অনলাইন ডেস্ক: ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত রেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘পিটিইনকা’ থেকে রেলের নতুন কেনা ২৫০টি যাত্রীবাহী কোচ আসতে শুরু করবে চলতি মাসের শেষ দিকে । প্রথম চালানে ৫০টি ব্রডগেজ কোচ এলেও এপ্রিল থেকে আসা শুরু হবে মিটারগেজ কোচগুলো। নতুন চালান এলে কোচ সংকট কমে যাওয়ার পাশাপাশি একাধিক ট্রেন সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে রেলের। এরই মধ্যে প্রথম চালানের ব্রডগেজ কোচের জিআইবিআর (গভর্নমেন্ট ইন্সপেক্টর অব বাংলাদেশ রেলওয়ে) পরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগকে অনুরোধ জানিয়েছে প্রধান যন্ত্র প্রকৌশল বিভাগ (উন্নয়ন)।

বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য মিটারগেজ ও ব্রডগেজ প্যাসেঞ্জার ক্যারেজ সংগ্রহ প্রকল্পের অধীনে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত রেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান পিটিইনকা থেকে এসব কোচ কেনা হচ্ছে। চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিষ্ঠানটি ১৫টি কোচ সরবরাহ করবে। এরপর ফেব্রুয়ারিতে ১৮টি কোচ এবং তৃতীয় চালানে ১৭টি ব্রডগেজ কোচ সরবরাহ করবে। প্রথম চালানের কোচগুলো ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বাংলাদেশে আসবে বলে জানিয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

৩ জানুয়ারি পশ্চিমাঞ্চল (রাজশাহী) রেলের প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলীকে নতুন কোচ আমদানি ও কমিশনিংয়ের বিষয়ে একটি চিঠি দেন বাংলাদেশ রেলওয়ের ক্যারেজ সংগ্রহ প্রকল্পের পরিচালক হারুন-অর-রশীদ। এতে জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কোচগুলোর প্রথম চালানের শিপমেন্ট দেবে বলে উল্লেখ করা হয়। এসব কোচ দ্রুত সময়ের মধ্যে কমিশনিংয়ের মাধ্যমে জিআইবিআর পরীক্ষার অনুমোদন গ্রহণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানানো হয়।

জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ও রেলের প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী (উন্নয়ন) হারুন-অর-রশীদ বণিক বার্তাকে বলেন, রেলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও কোচ ও ইঞ্জিন সংকটে সেবার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছানো যায়নি। নতুন এ প্রকল্পের অধীনে জানুয়ারিতেই নতুন কোচ বাংলাদেশে আসছে। এরপর ধারাবাহিকভাবে কোচগুলো প্রতি মাসেই বিভিন্ন লটে বাংলাদেশে আসবে। আগামী বছরের মে মাসের মধ্যেই সব কোচ রেলের বহরে যুক্ত হবে। ২৫০টি কোচ বাংলাদেশে এলে বাংলাদেশ রেলওয়ে আগের চেয়ে অনেক সমৃদ্ধ হবে বলে আশা করছেন তিনি।

জানা গেছে, প্রথম চালানে আসা ১৫টি কোচ আগামী মার্চে কমিশনিং, দ্বিতীয় চালানে আসা ১৮ কোচ এপ্রিলে এবং তৃতীয় চালানে আসা ব্রডগেজ কোচগুলো আগামী মে মাসের মধ্যে কমিশনিংয়ের অনুরোধ জানানো হয়। এজন্য পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোয় টেকনিক্যাল ডাটা, ড্রয়িং, মুভিং ডাইমেনশন ড্রয়িং ও গভর্মেন্ট রুলস ম্যাক্সিমাম মুভিং ডাইমেনশন পাঠানো হয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলে ব্রডগেজ ও ডুয়ালগেজ সেকশনে এবং যমুনা সেতু পারাপারসহ পূর্বাঞ্চলে ডুয়ালগেজ সেকশনে ওই ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচগুলো চলাচলে কমিশনিং শেষে জিআইবিআর অনুমোদন নেয়া হলে দ্রুত কোচগুলো যাত্রী পরিবহনের উপযোগী হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ব্রডগেজ কোচগুলো আসার পর এপ্রিল থেকে ধারাবাহিকভাবে ২০০টি মিটারগেজ কোচ আসবে। প্রতিটি চালানে ২২টি করে কোচ আসবে বাংলাদেশে। এভাবে ২০২০ সালের মে মাসের মধ্যে সব কোচ বাংলাদেশে চলে আসবে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ নভেম্বর ক্যারেজ সংগ্রহ প্রকল্পের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উৎপাদনকারী কোম্পানি পিটিইনকার কারখানা পরিদর্শন করেন। আটদিনের ওই সফরে বিভিন্ন টাইপের কোচের নকশা ও প্রস্তুতকৃত একটি করে কোচ পরীক্ষা করে তারা চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। অর্ডার অনুযায়ী কোচগুলো তৈরি হচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে প্রতিবেদন প্রদানের পরই বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য বাণিজ্যিকভাবে কোচ তৈরির কাজ শুরু করে কোম্পানিটি।

এর আগে ডিসেম্বরের মধ্যে ১৫টি এবং চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির মধ্যে ব্রডগেজ কোচগুলো বাংলাদেশে আসার কথা থাকলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এক মাস বিলম্বে এসব কোচ সরবরাহ শুরু করতে যাচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার কোম্পানিটি। ২৫০টি কোচ আমদানিতে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) দিচ্ছে ১ হাজার কোটি ৮৬ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ সরকার ব্যয় করছে ৩৭৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি কোচ আমদানিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের খরচ হচ্ছে সাড়ে ৫ কোটি টাকা।

এদিকে নতুন ৫০টি ব্রডগেজ (বিজি) কোচের কাপলিং পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ। দেশে চলাচলরত ট্রেনের অন্যান্য কাপলিংয়ের সঙ্গে মিল না থাকায় নতুন কোচগুলো নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ রেলওয়ের কোচগুলোর অধিকাংশেই চেইন স্ক্রু বেইজড কাপলিং রয়েছে। এক দশক ধরে আমদানি করা কোচগুলোয়ও একই ধরনের কাপলিং থাকায় কোচ সংকট কাটাতে তাত্ক্ষণিকভাবে যেকোনো ট্রেন থেকে কোচ পরিবর্তন, সংযোজন ও বিয়োজন করা যায়। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া থেকে কেনা কোচে সেমি অটোমেটিক বা সিবিসি পদ্ধতির কাপলিং (দুটি কোচের সংযুক্তির হুক) থাকায় নতুন ৫০টি ব্রডগেজ কোচ অন্য কোনো কোচের সঙ্গে সংযুক্ত করা যাবে না। এতে শুধু নতুন কোচগুলো দিয়ে নির্ধারিত রেক তৈরি করতে হবে। রেলের বহরে থাকা পুরনো কোচের সঙ্গে এগুলোকে যুক্ত করা যাবে না। কোনো রেক বা ট্রেনে হঠাৎ করে কোচ সংকট দেখা দিলে নতুন কোচগুলো তাতে সংযুক্ত করা যাবে না। এ কারণে ট্রেনগুলোর জন্য আলাদা স্পেয়ার কোচ রাখতে হবে। কাপলিং সমস্যার কারণে বড় বিনিয়োগে নতুন কোচ সংগ্রহের পরও রাজস্ব আয়ে রেলওয়ে পিছিয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।

এদিকে ২০০টি মিটারগেজ ও ৫০টি ব্রডগেজ কোচের রেক সাজাতে এরই মধ্যে একটি প্রস্তাব দিয়েছে রেলের পরিবহন বিভাগ। আগের কোচগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে আমদানি করা এমজি কোচগুলো পূর্বাঞ্চল রেলের বেশকিছু আন্তঃনগর ট্রেনে সংযোজনের পরিকল্পনা করছে রেলওয়ে। এর মধ্যে বিজয় এক্সপ্রেস, পাহাড়িকা, উদয়ন, উপকূল, সুবর্ণ, চট্টলা, যমুনা, উপবন, জয়ন্তিকা ট্রেনের রেকগুলো নতুন কোচ দিয়ে সাজানো হবে। বর্তমানে চট্টলাসহ রেলের বেশ কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেন দ্বিতীয় শ্রেণীর কোচ দিয়ে চলাচল করে। চট্টগ্রাম-সিলেট ও ঢাকা-সিলেট রুটের ট্রেনগুলোর কোচও পুরনো। নতুন ক্রয় করা কোচ দিয়ে পুরনো রেক নতুন করে সাজানো হবে।

সক/