মিয়ানমারকে আইসিসি’র কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আহ্বান জাতিসংঘ দূতের

রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের ঘটনায় মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)’র কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত ইয়াংহি লি। সোমবার জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের ৪০তম সেশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সি।

২০১৭ সালের আগস্টে নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলার পর রাখাইনে পূর্ব পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। বর্মি বাহিনী ও দেশটির উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের হাত থেকে জীবন ও সম্ভ্রম বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ওই অভিযানে জাতিগত নিধনযজ্ঞের আলামত পেয়েছে। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরাতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার চুক্তি করলেও এখনও শুরু হয়নি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। এর মধ্যেই সোমবার বিষয়টি আইসিসি’তে তোলার আহ্বান জানালেন জাতিসংঘ দূত।

ইয়াংহি লি বলেন, মিয়ানমার পরিস্থিতি অবশ্যই আইসিসি’তে তোলা উচিত। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, কোনও দেশ কিংবা বিভিন্ন দেশের জোট থেকে এ বিষয়টি সেখানে তোলা যেতে পারে।

মিয়ানমারের মংডু`তে পুড়িয়ে দেওয়া একটি রোহিঙ্গা গ্রাম। ছবি: রয়টার্স।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক এই বিশেষ দূত বলেন, ঘটনার শিকার মানুষদের যন্ত্রণা লাঘবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এগিয়ে আসা উচিত। এ ব্যাপারে বৈশ্বিক নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে অপেক্ষমান থাকতে তাদের বাধ্য করা উচিত নয়। বিষয়টি যদি আইসিসি’তে তোলা সম্ভব না হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত একটি স্বাধীন ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা বিবেচনা করা।

এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের সেনাপ্রধান স্বীকারোক্তি দেন যে, ‘রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে’। জাপানি সংবাদমাধ্যম আশাহি শিমবুনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর একাংশ এই নিপীড়ন চালিয়ে থাকতে পারে। তবে এতে সেনা-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অতীতের ধারাবাহিকতায় আবারও নাকচ করে দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা নিপীড়নের ‘সুনির্দিষ্ট প্রমাণ’ নেই।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও সংবাদমাধ্যম রোহিঙ্গা নিপীড়নে সেনা সংশ্লিষ্টতার আলামত পেয়েছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে ইন দিন গ্রামের এক গণহত্যায় সেনা-সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ হাজির করা হয়। ২০১৮ সালে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনেও রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যা প্রবণতার আলামত মেলে। তা সত্ত্বেও নিপীড়নের কথা অস্বীকার করে আসছে মিয়ানমার‍।

২০১৮ সালের আগস্টে রাখাইনের মানবাধিকার হরণের ওপর জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন তাদের প্রতিবেদন হাজির করে। তদন্তের ফলাফলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর পরিচালিত অভিযানকে ‘গণহত্যার উদ্দেশ্যতাড়িত’ আখ্যা দেওয়া হয়। গণহত্যায় জড়িত থাকার আলামত সাপেক্ষে মিয়ানমারের সেনাপ্রধানসহ ৬ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার বিচার দাবি করা হয় সেই তদন্ত প্রতিবেদনে। এরপর বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক মিয়ানমারের সেনাপ্রধানকে নিষিদ্ধ করে। রয়টার্স বলছে, মিন অং হ্লায়াং এক সময় ফেসবুকে কথা বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে তার কথা বলার ঘটনা খুব বিরল।

আন্তজার্তিক অপরাধ আদালতের সনদ ও রোম স্ট্যাচুতে স্বাক্ষরকারী দেশ না হওয়ায় মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, তাদের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারের এখতিয়ার নেই। এমন প্রেক্ষিতেই প্রয়োজনে স্বাধীন একটি ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা বলেন জাতিসংঘ দূত।