গলা ও বুক জ্বালা-পোড়ার বিভিন্ন কারণ ও করণীয়

শারীরিক সমস্যার মধ্যে বুক ও গলা জ্বালাপোড়া একটি বড় সমস্যা। বর্তমানে এমন কোন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে একবারের জন্যও বুক জ্বালাপোড়া সমস্যায় ভুগে নাই। এই বুক জ্বালাপোড়ার কারণ তাৎক্ষণিক কি ব্যবস্থা নেওয়া যায় সে বিষয়ে আসুন বিস্তারিত জেনে নিই।

গলা ও বুক জ্বালা-পোড়া কী?

বুক জ্বালা পোড়া হচ্ছে-বুকের ভিতরের মধ্যবর্তী স্থান থেকে শুরু করে গলা পর্যন্ত জ্বালাকর অনুভুতি। এই জ্বালা কখনও কখনও শুধু বুকে আবার কখনও কখনও শুধু গলায় বা উভয় স্থানে হতে পারে। মাঝে মাঝে জ্বালার সাথে ব্যাথ্যা থাকতে পরে। কিন্তু এই বুক জ্বালাপোড়া করলে তাৎক্ষণিক কি ব্যবস্থা নেওয়া যায় সে বিষয়ে আমাদের অনেকেরই জানা নেই।

যদি কারও বুক জ্বালা-পোড়া করে, গলায় জ্বলুনি হয়, কিংবা গলার ভেতরের দিকে ঝাল, টক বা লবণাক্ত কোনো তরলের অস্তিত্ব অনুভুত হয়, সেই সঙ্গে ঢেকুর উঠে তাহলে ধরে নিতে হবে এগুলো  গ্যাসের সমস্যা থেকে তৈরি হয়েছে।  আর যদি বুকের জ্বালা-পোড়া যদি খুব বেশি হয়, পাশাপাশি এ ধরনের অস্বস্তিসহ ব্যথা বুক থেকে বাহু ও কাঁধের দিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তাহলে হূদযন্ত্রের কোন সমস্যার কারণে হচ্ছে কিনা সেটি মাথায় রাখতে হবে এবং জরুরি ভিত্তিতে দ্রুত হূদেরাগ বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে।

অনেকেই হঠাৎ বুক জ্বালা-পোড়া হওয়া মাত্রই অ্যান্টাসিড জাতীয় ঔষধ খেয়ে ফেলেন। কিন্তু উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিত হূৎস্পন্দন, কিডনি রোগ, পায়ুনালির সমস্যা কিংবা অ্যাপেন্ডিসাইটিসের কোনো লক্ষণ আছে কি না, সে ব্যাপারে চিকিৎসকের  সাথে পরামর্শ না করে অ্যান্টাসিড সেবন করা উচিত নয়।

বুকের ব্যথ্যা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় ও বাম বাহুতে চলে আসে এবং ব্যায়াম করার সময় বৃদ্ধি পায়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

গলা ও বুক জ্বালা-পোড়ার কারণসমূহ

এই রোগের প্রধান কারণ হিসেবে গ্যাস্ট্রো ইজোফ্যাকাল রিফ্লেক্স ডিজিজ (Gastroesophageal Reflux Disease) বা সংক্ষেপে গার্ড (GERD) কে দায়ী করা হয়। মাঝে মাঝে কিছু তরল পদার্থ পাকস্থলী থেকে গলনালী দিয়ে মুখ চলে আসে, অর্থাৎ উল্টা পথে ধাবিত হয়, একেই বলা হয় Gastro esophageal reflux.  চিকিৎসা বিজ্ঞানের দীর্ঘদিনের গবেষণায় বুক জ্বালাপোড়ার বিভিন্ন কারণ খুঁজে পাওয়া গেছে। এগুলো হচ্ছে –

  • ভাজাপোড়া ও তৈলাক্ত খাবার বেশি পরিমাণে খাওয়া।
  • বুক জ্বালাপোড়ার আরও একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে ধুমপান করা।
  • অ্যালকোহল সেবন বা মদ্য পান করা।
  • অতিরিক্ত মাত্রায় চা, কফি ইত্যাদি পান করা।
  • অতিরিক্ত মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তাগ্রস্থ থাকা অনেক সময় বুক জ্বালাপোড়ার জন্য দায়ী।
  • কালো গোল মরিচ, সিরকা যুক্ত খাবার বেশি খাওয়া।
  • আচার, টমেটোর সস, কমলার রস, পেয়াজ, পিপারমেন্ট ইত্যাদি খাবার অনেক সময় বুক জ্বালাপোড়ার জন্য দায়ী।
  • পিত্ত থলিতে পাথর থাকলেও বুক জ্বালাপোড়া হতে পারে।
  • এছাড়া পাকস্থলীর উপর চাপ পড়ে এমন কাজ যেমন এক সাথে বেশি পরিমাণ খাওয়া, স্থুলতা, গর্ভাবস্থা, শক্ত ও মোটা বেল্টের প্যান্ট পড়া ইত্যাদি কারণেও বুক জ্বালাপোড়া হতে পারে।

বুক ও গলা জ্বালাপোড়ার লক্ষণসমূহ: 

অনেকেরই প্রায়ই বুকে জ্বালাপোড়া হয়ে থাকে। তবে কিভাবে বুঝবেন আপনি বুক জ্বালাপোড়ায় ভুগছেন। নিম্নে বুক জ্বালাপোড়ার বিভিন্ন লক্ষণসমূহ আলোচনা করা হলো:

  •  পেটের উপরের দিকে মৃদু ব্যথ্যা অনুভূত হওয়া।
  •  বুকের ব্যথ্যার সাথে জ্বালা জ্বালা ভাব থাকা।
  • কারও কারও বুক জ্বালা খালি পেটে আবার কারও খাবার গ্রহণের পরে হয়।
  • বুক জ্বালা পোড়া হওয়ার মাঝে মাঝে ঢেকুর উঠতে পারে।
  • পাকস্থলীর এসিড সম্প্রসারিত হয়ে খাদ্যনালীর উপর পর্যন্ত চলে আসলে বুকে ব্যথ্যা ও জ্বালা হতে পারে। এই ব্যাথ্যা ও জ্বালা কখনও স্বল্পস্থায়ী আবার কখনও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
  • বিশ্রামের সময় বুক জ্বালাপোড়া ও ব্যাথ্যার বৃদ্ধি হয়। শুয়ে থাকা বা আধো শোয়া অবস্থায় এসিড খাদ্যনালী দিয়ে উপরে উঠে আসে। ফলে বুক জ্বালাপোড়া হয়। যখন সোজা হয়ে বসে থাকা হয় তখন মধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে খাদ্যবস্তুসমুহ পাকস্থলীতে থাকে, তাই বুক জ্বালাপোড়া কম হয়।
  • বুক জ্বালা পোড়ায় মুখে তিতা স্বাদ অনুভুত হতে পারে বিশেষ করে সকালের দিকে বেশি ঘটে থাকে।
  • স্বরভঙ্গ বুক জ্বালপোড়ার একটি অস্বাভাবিক লক্ষণ। অম্ল বা এসিড পাকস্থলি থেকে গলা পর্যন্ত উঠে আসলে এরকম হতে পারে। আর এই এসিড কন্ঠস্বরকে ভারি করে তোলে ও স্বরভঙ্গ হয়ে থাকে ।
  • বুক ও গলা জ্বালার সাথে গলায় ক্ষত হতে পারে, মনে হয় যেন গলা ছিলে গেছে। এসিডের কারণে এমনটি হয়। তাই খাবার গ্রহণের পরপর এ রকম হলে বুঝতে হবে এটা বুক জ্বালাপোড়ার সাথে সম্পৃক্ত।
  • বুক জ্বালা পোড়া হওয়ার সাথে বমিবমি ভাব ও বমি হতে পারে।
  • দীর্ঘ দিন যাবৎ বুক জ্বালাপোড়া চলতে থাকলে এসিডের কারণে খাদ্যনালী সংকুচিত হয়ে খাবার গিলতে কষ্ট হতে পারে।

বুক জ্বালাপোড়া প্রতিরোধের উপায়:

একটি কথা প্রচলিত আছে যে, Prevention is batter then cure অর্থাৎ রোগ হওয়ার আগেই সচেতন হওয়া ভাল। তবে অবস্থা খারাপ হলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ সেবন করতে হবে। ওষুধ ব্যতীত বুক জ্বালাপোড়া থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের কিছু নিয়ম মেনে চলা দরকার। নিয়মগুলো হলো:

  • যেসব খাবার খেলে বা পানীয় পান করলে বুক জ্বলা-পোড়া করে, সেগুলো খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। এসব খাবারের মধ্যে থাকতে পারে টমেটো, কমলালেবু, লেবু, রসুন, পেঁয়াজ, চকলেট, কফি, চা কিংবা কোমল পানীয়।
  • ভাজা মাংসের পরিবর্তে সেঁকা অথবা ঝলসানো মাংস খাওয়া, কম তেল-চর্বিযুক্ত ও মসলাযুক্ত খাদ্য গ্রহণে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
  • একসাথে বেশি পরিমাণে না খেয়ে কিছুক্ষণ (২ ঘণ্টা) পরপর অল্প অল্প করে খেতে হবে। ফলে খাবার দ্রুত হজম হবে এবং পেটে অতিরিক্ত গ্যাস ও এসিড উৎপন্ন হবে না।
  • খাওয়ার পরপর শুয়ে পড়া যাবেনা। অন্তত ১ ঘন্টা অপেক্ষা করে তারপর ঘুমুতে যাওয়া উচিত।
  • ঘুমানোর সময় বিছানা থেকে মাথাকে ৪ থেকে ৬ ইঞ্চি উচুতে রেখে শয়ন করতে হবে।
  • অবশ্যই ধুমপান বর্জন করতে হবে।
  • শরীরের বাড়তি ওজন থাকলে তা কমিয়ে ফেলতে হবে।
  • মোটা বেল্টের প্যান্ট না পরে ঢিলেঢালা পোশাক পরতে হবে।  
  • অবশ্যই মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে চেষ্টা করতে হবে।

 

আমাদের এই যান্ত্রিক জীবনের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলেছে ছোট বড় অনেক সমস্যা। তার মধ্যে একটি হলো বুক জ্বালাপোড়া বা Heart burn। অনেকের বুক জ্বালা-পোড়ার মতো সমস্যা হতে পারে কোনো রকম শারীরিক কারণ ছাড়াই। এ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে সবচেয়ে বড় চিকিৎসক হয়ে উঠতে হবে নিজেকেই।এজন্য নিজেকে দুশ্চিন্তা ও চাপমুক্ত থাকার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর নিয়্মাবলি মেনে জীবন যাপন করতে হবে।