পুত্র ‘হিরো’, পুত্রের মা-বাবা বলদ এবং আহাম্মক!

শিশু নাঈম। বনানী অগ্নিকাণ্ডকে ঘিরে যাকে নিয়ে মিডিয়ার উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। অথচ এটা ছিল একটা সাইড স্টোরি, মেইন স্টোরি ছিল মানুষের মৃত্যু এবং তার কারণ। অথচ এমন সব স্টোরিকে ছাপিয়ে অগ্রগণ্য হয়ে উঠেছে নাঈম। রীতিমত তারকা বলা যায় তাকে। টিভিতে সাক্ষাতকারে ডাকা হচ্ছে। প্রবাসী একজন তাকে পাঁচ হাজার ডলার দিতে চেয়েছেন। নাঈম টিভিতে বলেছে, সেই ডলার সে এতিমখানায় দিয়ে দিতে চায়। সব খবরকে পেছনের ফেলার মতন আরেকটি ডাইভার্শন তৈরি। ছোট্ট একটা ছেলে, কী মানবিকতা তার, সে কিনা পাঁচ হাজার ডলার দিয়ে দিতে চায় এতিমখানায়। টিভি সাক্ষাতকারে তার মা-বাবাও এসেছিলেন। আচ্ছা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের একটি ছেলে, সেকি জানে পাঁচ হাজার ডলারে কত টাকা? জানি এসব প্রশ্ন মানে বর্তমান স্রোতের বিরুদ্ধে যাওয়া। কিন্তু মূল স্টোরিকে পেছনে ফেলে যখন সাইড স্টোরি কভারপেজ দখল করে নেয়, তখন প্রশ্নটা কারো না কারো করতেই হয়, দাঁড়াতে হয় স্রোতের বিপরীতে।

রাজধানীর নিম্নবিত্ত, দরিদ্র পরিবারের ছেলেদের, বস্তিতে যাদের বেড়ে ওঠা, তাদের খেলার প্রধান জায়গা হলো রাস্তা। রণবী যাদের নাম দিয়েছিলেন ‘টোকাই’। যাদের জন্য রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারেনি অন্ন-বস্ত্র-বাস্থস্থান-স্বাস্থ্য। একসময় যখন হরতাল হতো, তখনের কমন চিত্র ছিল, ‘টোকাই’দের রিকশার হাওয়া ছেড়ে দেওয়া। এই কাজটা তারা উৎসাহের সাথে করত। হুমায়ূন আহমেদ তার হিমুকে নিয়ে লেখা গল্প এবং উপন্যাসে এমন চিত্র অনেকবার হাজির করেছেন। পুরান ঢাকার লোহার পুলের কথা মনে আছে কী কারো, থাকলে মনে করে দেখুন রিকশা আটকে গেছে, রিকশায় বিব্রত মুখে তরুণী, তাকে উদ্ধারে এগিয়ে এসেছে ‘টোকাই’ নামের সেই বালকেরাই। রাস্তার মাঝখানে ধনীলোকের গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেছে, ঠেলে নিতে হাজির সেই বালকেরাই। চায়ের দোকানে চা শেষ করেছেন, আপনার বেনসন ওই দোকানে নেই, পাশের দোকান থেকে এনে দেবে সেই বালকেরাই। এটাই এখানের স্বাভাবিক চিত্র। কিন্তু এই স্বাভাবিকতাকে যখন অনন্য উচ্চতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়, তখন পেছনের উদ্দেশ্যটা নিয়ে প্রশ্ন উঠাটাও অস্বাভাবিক নয়।

একজন বালকের সাহসিকতা এবং মানবিকতা, অবশ্যই খবর হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি খবরের জন্য কিছু হোমওয়ার্ক প্রয়োজন, খবরের গ্রাউন্ড জানা প্রয়োজন, আর এই জানাটা হলো প্রতিবেদন তৈরির অন্যতম কাজ। হুজুরের ওয়াজের গল্পটা বলি, ‘হুজুর চোখ বন্ধ করে ওয়াজ করছেন। একসময় ওয়াজ শেষ করে চোখ খুললেন, দেখলেন তার সামনে কেউ নেই, শুধু একজন মানুষ বসে আছেন। হুজুর বললেন, এত মানুষের মধ্যে শুধু একজনই দেখলাম ধর্মের কথা শুনছেন। আপনাকে ধন্যবাদ আপনি এতক্ষণ বসে আছেন দেখে। উত্তরে সেই মানুষটি বলল, হুজুর আমিও চলে যেতাম, কিন্তু যে চাদরের উপর বসে আপনি ওয়াজ করছেন, সে চাদরটি আমার। ওটা না নিয়ে বাড়িতে গেলে স্ত্রী আস্ত রাখবে না।’ সুতরাং সাংবাদিকদের ‘হুজুর’ হবার আগে গ্রাউন্ডটা জেনে নিতে হবে, হোমওয়ার্কটা করতে হবে।

বনানী অগ্নিকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে অনেক। সামাজিকমাধ্যমে অগ্নিনির্বাপন বিষয়ক একটি মহড়ার ভিডিও ঘুরছে। তাতে দেখা যায়, বহুতল ভবনে আগুন লেগেছে, সেই ভবনের নিচে বাতাসে ফোলানো এয়ার ব্যাগ বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। যাতে মানুষ তাতে লাফিয়ে পড়ে জান বাঁচাতে পারে। এমন এয়ার ব্যাগ বনানী অগ্নিকাণ্ডে ব্যবহার হয়নি কেন, প্রশ্নটা কি গণমাধ্যমের মূল খবর হয়েছে? আগুন নেভাতে যে ফায়ার স্যুটের প্রয়োজন, সেই স্যুটের দেখা কি মেলেছে বনানীতে? সাইফুদ্দিন আহমেদ নান্নু সামাজিকমাধ্যমে প্রশ্ন করেছেন, ‘আগুন নেভাবার জন্য এসব এলাকায় পানির রিজার্ভার নেই কেন? ঢাকা শহর জলাধার শূন্য কেন?’ এর সাথে মূল প্রশ্ন হতে পারে একটি ভবন নির্মাণে ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, সেই অনুমোদন পাওয়ার প্রক্রিয়াটা কী?

আগুন প্রশ্নে অনেকে দেখলাম পাবলিককে গালাগালি করেছেন ভিড় বাড়ানোর জন্য। যেন ভিড় না বাড়ালে উনারা এসে সব উদ্ধার করে ফেলতেন। অনেকে আহাম্মক বলেছেন, বলদ বলেছেন সেই পাবলিকদের। এই বলদ পাবলিকের মধ্যে কিন্তু ওই বাচ্চা ‘নাঈম’ও। তার বাবা-মা বলদ আর আহাম্মক বলেই নাঈমদের এমন বিপদের মাঝেও রাস্তায় ছেড়ে দিয়েছেন। যারা পাবলিককে বলদ বলেন, তাদের মতন ‘ষাঁড়’ হলে ওই বাচ্চাটিকে রাস্তায় ছাড়তেন না। স্বঘোষিত সেই বুদ্ধিমানরাই নাঈমকে ‘হিরো’ বানান, আর বাচ্চাটির বাবা-মাদের গালি দেন বলদ আর আহাম্মক বলে। এমন দ্বি-চরিত্র যাদের, তাদের কাজের পেছনে আদর্শ থাকে না, উদ্দেশ্য থাকে।’

‘বলদ’ গালি দেওয়া ‘ষাঁড়’দের উদ্দেশে সেই সাইফুদ্দিন আহমেদ নান্নু বলেছেন, ‘ভুলে যান কেন, আগুন দেখতে আসা এই আহাম্মকেরাই দল বেঁধে রানা প্লাজার উদ্ধার তৎপরতায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

রানা প্লাজার তারেক কায়কোবাদের নাম মনে আছে? কায়কোবাদও এমন আহাম্মকের দলে ছিল। উদ্ধার তৎপরতা চালাতে গিয়েই লোকটা মরেছিল।

মনে আছে নিমতলীর সেই বেড়াতে বের হওয়া তরুণকে, যে তার সদ্য পরিণীতা স্ত্রীকে রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে ভিড় ঠেলে একটি শিশুকে আগুন থেকে উদ্ধার করে নিজেই পুড়ে মরেছিল।’

সামাজিকমাধ্যমে করা সাইফুদ্দিন আহমেদ নান্নু করা কথা ও প্রশ্নের বিপরীতে কী বলবেন স্বঘোষিত বুদ্ধিমানরা। যারা গল্পের গোড়া ছেড়ে ডালে চড়ে লম্ফঝম্ফ করেন। অনুসরণ মানুষের কাজ, অনুকরণ নয়। ওটা অন্য প্রাণির কর্ম। সুতরাং বেঁধে দেওয়া গতে সুর না সেধে, প্রয়োজনীয় রাগে সুর বাধাটাই উত্তম। তাতে আর যাই হোক আনন্দে বেহাগ বাজবে না, বিষাদে বাজবে না বসন্তের হিন্দোল।

পুনশ্চ: কেভিন কার্টারের কথা মনে আছে? ওই যে, দক্ষিণ আফ্রিকার ফটো সাংবাদিক। ‍যিনি ১৯৯৩ এর সুদানের দুর্ভিক্ষের একটি ছবি তুলে পুলিৎজার পুরস্কার পান। ছবিতে দুর্ভিক্ষ পীড়িত একটি মৃতপায় শিশুর পার্শ্বে বসে একটি শকুন প্রতীক্ষায়। ছবিটি রীতিমত শোরগোল ফেলেছিল। কিন্তু ওই শিশুটির দুরাবস্থার ছবি তুলতে গিয়ে শিশুটিকে না রক্ষার মনোবেদনায় শেষ পর্যন্ত কেভিন কার্টার আত্মহত্যা করেছিলেন। শিশু ‘নাঈম’দের আগুনের সামনে, বিপদের সামনে ‘হিরো’ হতে উৎসাহিত করার আগে কেভিন কার্টারকে স্মরণে নেওয়াটাও জরুরি।