সব ট্রাকের পণ্য নামিয়ে পরীক্ষার আদেশ স্থগিত

কলকাতার পেট্রাপোল বন্দর হয়ে বাংলাদেশে পণ্য আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে প্রতিটি পণ্যের চালান খালাস করার আগে ট্রাক থেকে পণ্য নামিয়ে শতভাগ পরীক্ষার আদেশ স্থগিত করা হয়েছে। ভারতের কলকাতার কাস্টমস কমিশনার থেকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি সোমবার বিকালে পেট্রাপোল বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে এসে পৌঁছেছে।

বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ বেলাল হোসেইন চৌধুরী জানান, ভারতীয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষের যে নির্দেশনা দেয়া হয় সেটি আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভোগান্তি বাড়াবে। তবে ব্যবসায়ীদের ভোগান্তির কথা মাথায় রেখেই তারা তাদের আদেশ প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

উল্লেখ্য, এর আগে ১৬ এপ্রিল ভারতের কলকাতার চিফ কাস্টমস কমিশনার স্বাক্ষরিত এক আদেশে বলা হয়ছিল, এখন থেকে ভারত থেকে যত পণ্য বাংলাদেশে রফতানি হবে এবং বাংলাদেশ থেকে ভারতে যত পণ্য আমদানি হবে তার প্রতিটি পণ্যের চালান পেট্রাপোল বন্দর এলাকায় ট্রাক থেকে নামিয়ে শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করে খালাস দেয়ার অনুমতি দিতে হবে। এছাড়া কোনো পণ্য বোঝাই ট্রাক পেট্রোপোল বন্দর ত্যাগ করতে পারবে না।

এই আদেশ জারির পর পেট্রাপোল বন্দরের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সব ট্রাকের প্রতিটি পণ্য নামিয়ে পরীক্ষা করা শুরু করে। এতে বন্দরে পণ্য বোঝাই ট্রাকের জট লেগে যায়। কেননা পেট্রাপোল বন্দরের কাঠামো ততটা শক্তিশালী নয়। সব পণ্য ট্রাক থেকে নামিয়ে পরীক্ষা করার সক্ষমতাও সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্তৃপক্ষের নেই। এছাড়া বন্দরে পর্যাপ্ত জায়গা, জনবল ও পণ্য উঠানো-নামানোর যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা না থাকায় ভারতের পেট্রাপোল কাস্টমস কর্তৃপক্ষ শতভাগ পণ্য পরীক্ষার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে।

এতে ব্যবসায়ীরা আপাতত খুশি হলেও পুরোপুরি দশ্চিন্তামুক্ত হতে পারছেন না। কেননা কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ওই আদেশ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। এটি আবার চালু করলে বন্দরে পণ্যের জট লেগে যাবে। ভারতের পেট্রাপোল কাস্টমস স্টাফ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কার্তিক চন্দ্র দাস জানান, বাংলাদেশের মতো পণ্য রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা পেট্রাপোল বন্দরে নেই। ফলে এমনিতেই সেখানে সারা বছর পণ্য জট লেগেই থাকে। নতুন আদেশের ফলে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে বড় ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হতো।

শতভাগ পরীক্ষার যেসব সমস্যা হবে তা আমরা কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে বোঝাতে সক্ষম হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত স্থগিত করে আগের নিয়মেই পণ্য খালাস দেয়া হচ্ছে। সূত্র জানায়, পেট্রাপোল বন্দরে সোমবার পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার পণ্য বোঝাই ট্রাক আটকে আছে। এগুলো পরীক্ষা করে খালাস দিতে আরও সময় লাগবে।

এদিকে রোজার বাজার ধরতে অনেক ব্যবসায়ী পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ডালসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করছেন। যেগুলো বন্দরে আটকে রয়েছে। এগুলো খালাস করতে দেরি হওয়ায় সারা দেশের বাজারগুলোতে সরবরাহ করতেও দেরি হবে। এদিকে রোজার বাকি আছে আর মাত্র দু’সপ্তাহ।

আমদানিকারকরা জানান, বিভিন্ন অব্যবস্থাপনার কারণে এমনিতেই একটি পণ্যের চালান ভারত থেকে আমদানি হয়ে বাংলাদেশে আসতে ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লেগে যায়। জট লাগার কারণে এখন পণ্য আসতে আরও বেশি সময় লাগবে। এতে আমদানি-রফতানির খরচও বেড়ে যাবে।

ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, ওই আদেশ প্রত্যাহার করার কারণে এখন বন্দরে পণ্য খালাসে গতি আসবে। ফলে চলমান সংকট দ্রুতই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি মফিজুর রহমান সজন জানান, আমদানি পণ্যের শতভাগ পরীক্ষা বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়তো বা অস্থায়ী। সেটা যে কোনো সময় আবার কার্যকর হতে পারে। তাই বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের বাণিজ্যসংশ্লিষ্টদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের দরকার। তা না হলে পরে ব্যবসায়ীরা আবার একই সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন।

সূত্র জানায়, ১৬ এপ্রিল কলকাতা কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এই আদেশ জারির পর বন্দরে পণ্য খালাসে অচলাবস্থা দেখা দিলে বেনাপোল বন্দর থেকে বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) উচ্চ পর্যায়ে জানানো হয়। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে ভারত সরকারের উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করা হয়। দুই পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতে সোমবার ওই আদেশ স্থগিত করা হয়।

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে আগে পেট্রাপোল বন্দরে পণ্যের পরীক্ষা হয়। তারপর তারা খালাস করলে সেটি বাংলাদেশের বেনাপোল বন্দরে আসে। সেখানেও আবার পরীক্ষা করে খালাস দেয়া হয়। তেমনি রফতানির ক্ষেত্রে বেনাপোল বন্দরে পণ্যের পরীক্ষা করে খালাস দিলে সেটি যায় পেট্রাপোল বন্দরে। সেখানে পরীক্ষা করে খালাস দিলে সেটি ভারতের বাজারে প্রবেশ করে। এসব পরীক্ষা হয় দৈবচয়ন ভিত্তিতে। কোনো সন্দেহ হলে পণ্য নামিয়ে পরীক্ষা করা হতো।

বেনাপোলের আমদানিকারক ইদ্রিস আলী বলেন, ভারতীয় পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক পরিশোধ করতে হয় বেনাপোল বন্দরে। এখানে আমাদনিকারকদের পণ্য পরীক্ষা করেই খালাস নিতে হয়। পণ্যের চালান পেট্রাপোল বন্দরে পরীক্ষা করা হয়। এগুলো পরীক্ষা করা হয় ট্রাকের মধ্যে রেখেই। ট্রাক নামিয়ে পরীক্ষা করা হলে উভয় দেশের ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি হতো। পণ্যের খরচ বাড়ত, আমদানি-রফতানিতে বেশি সময় লাগত। ওই আদেশ প্রত্যাহার করায় এখন আপাতত ভোগান্তির নিরসন হয়েছে।