খরচ-সময় সবই বেশি

চট্টগ্রাম বন্দরে আসা পণ্য শুল্ক্কায়ন শেষে খালাস করতে লাগছে মাত্রাতিরিক্ত অর্থ ও সময়। বিশ্বব্যাংকের এক হিসাব অনুযায়ী গার্মেন্টের পণ্যভর্তি ২০ ফুট দৈর্ঘের একটি আমদানি কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে খালাস করতে ব্যবসায়ীদের খরচ হচ্ছে প্রায় ৫৮৮ ডলার বা ৫০ হাজার টাকা।

একই মাপের কনটেইনারে করে একই পরিমাণ পণ্য আবার রফতানি করতে খরচ পড়ছে ২৯৮ ডলার বা প্রায় ২৫ হাজার টাকা। আবার এমন আমদানি-রফতানি কনটেইনারের নথিপত্র যাচাই-বাছাই করতে সময় লাগছে ছয় থেকে সাত দিন। অথচ সিঙ্গাপুর বন্দরে এ সময় লাগছে মাত্র তিন থেকে সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা। এ বন্দরে প্রতিটি কনটেইনার আমদানি-রফতানিতে খরচও বাংলাদেশের তুলনায় তিন ভাগের এক ভাগ। প্রসঙ্গত, ২০ ফুটের একটি কনটেইনারে গড়ে ১২ টন আমদানি পণ্য ও ১০ টন রফতানি পণ্য পরিবহন করা যায়।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল জুলফিকার আজিজ বলেন, ‘কোন দেশে ব্যবসা করতে কী পরিমাণ সময় ও অর্থ দরকার হয় বিশ্বব্যাংক সে সম্পর্কে একটি ধারণা দিয়েছে। তাদের সর্বশেষ ধারণা অনুযায়ী ঢাকার কোনো ফ্যাক্টরি থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত একটি রফতানি কনটেইনার পরিবহনে এখন ৪০৮ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৪ হাজার ৬৮০ টাকা) খরচ পড়ে। সময় লাগছে ১৬৮ ঘণ্টা বা সাত দিন। এতে আছে মহাসড়ক হয়ে পণ্য আনার খরচ ও সময়ের হিসাবও।

আইন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থা এ ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ায় জড়িত। এ হিসাব থেকে শুধু বন্দরের অংশটি আলাদা করলে ২০ ফুট রফতানি কনটেইনার খালাস পর্যায়ে আমাদের দেশে প্রায় ২৯৮ ডলার খরচ পড়ে। আমরা এটি ২০০ ডলারে নামিয়ে আনার টার্গেট নিয়ে কাজ করছি।’

চট্টগ্রাম বন্দরে রফতানি প্রক্রিয়ায় ওতপ্রোতভাবে যুক্ত আছে বিজিএমইএ। এ সংস্থার বন্দর ও কাস্টমস বিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন চৌধুরী জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম আগের চেয়ে কিছুটা গতিশীল হলেও সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের আরও অনেক সুযোগ রয়েছে। বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোতে রফতানি পণ্য নিয়ে এখনও দুই থেকে তিন দিন দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ফেব্রিকস বোঝাই ২০ ফুট দীর্ঘ একটি কনটেইনার ডিপোতে প্রবেশের পরপরই অন্তত চার হাজার টাকা ড্যামারেজ চার্জ দিতে হয়। স্টাফিং চার্জ দিতে হয় তিন হাজার ৬০০ টাকা।

ল্যান্ডিং চার্জ দিতে হয় প্রায় দুই হাজার টাকা। ওজন নেওয়ার ভিজিএম চার্জ দিতে হয় এক হাজার টাকা। ২০ ফুটের কনটেইনারে যদি ৫০০ কার্টন থাকে, তবে লেবার চার্জ গুনতে হয় আরও প্রায় দেড় হাজার টাকা। ক্লিয়ারেন্স সনদ নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে দিতে হয় প্রায় দুই হাজার টাকা। এভাবে বিভিন্ন সংস্থাকে বিভিন্ন খাতে অর্থ দিতে হয়। এতে করে খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়তি লাগছে সময়ও।

আমদানি প্রক্রিয়ার খরচ প্রসঙ্গে ফ্রেইট ফরোয়ার্ডস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন জানান, বন্দর জেটিতে গার্মেন্ট পণ্যবোঝাই একটি জাহাজ আসার পর তা ইয়ার্ডে রাখতে ২০ ফুট কনটেইনারে লোডিং চার্জ দিতে হয় ৬৩ ডলার বা পাঁচ হাজার ৩৫৫ টাকা। পণ্যের দাম ২০ হাজার ডলার হলে আগাম ইনকাম ট্যাক্স বাবদ ফি দিতে হয় এক হাজার টাকা, কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজে দিতে হয় দুই হাজার টাকা, বার্থ অপারেটরদের লেবার চার্জ বাবদ দিতে হয় এক হাজার ৬০০ টাকা, ডেলিভারি অর্ডার ইস্যুর জন্য শিপিং লাইন্সকে দিতে দুই থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা, ২০ হাজার ডলারের পণ্য হলে সি অ্যান্ড এফকে কমিশন বাবদ দিতে হয় ৩০ ডলার বা আড়াই হাজার টাকা। এর বাইরে দ্রুত পণ্য খালাস করতে হলে কাস্টমসের বিভিন্ন পয়েন্টে পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা স্পিডমানি হিসেবে বাড়তি দিতে হয়। এ কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে ২০ ফুট দীর্ঘ একটি কনটেইনার খালাস করতে হলে বিভিন্ন পয়েন্টে খরচ গুনতে হয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। রফতানির প্রক্রিয়াও শুরু করতে হয় পাঁচ ছয় দিন আগে থেকে। অথচ সিঙ্গাপুরে এ খরচ মাত্র ৪০ ডলার বা তিন হাজার ৪০০ টাকা। নথিপত্র যাচাই-বাছাই করতে তারা সময় নেয় মাত্র তিন ঘণ্টা।

জানতে চাইলে চিটাগং চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘বন্দর ও কাস্টমসে পণ্য খালাস কার্যক্রম আরও গতিশীল ও সাশ্রয়ী করার সুযোগ রয়েছে। সিঙ্গাপুরে যে কাজ তিন ঘণ্টায় হচ্ছে, এখানে সেটি করতে ছয় থেকে সাত দিনও সময় লাগছে। আবার সিঙ্গাপুরের তুলনায় আমাদের কনটেইনার-প্রতি ব্যয় তিন থেকে চার গুণ বেশি। চট্টগ্রাম বন্দরকে বিশ্বমানের করতে হলে এ বিষয়ে নজর বাড়াতে হবে। শিপিং এজেন্ট, সি অ্যান্ড এফ, বাংলাদেশ ব্যাংক, আণবিক শক্তি কমিশনসহ সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের কাজ সম্পন্ন করতে হবে দ্রুততম সময়ে।’

বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী সহজ ও সাশ্রয়ী ব্যবসার সূচকে ১৯০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৭তম। বাংলাদেশের তুলনায় সময় ও অর্থ কম খরচ হওয়ায় ভুটান ৭৫তম, ভারত ১০০তম, নেপাল ১০৫তম, শ্রীলংকা ১১১তম, মালদ্বীপ ১৩৬তম ও পাকিস্তান আছে ১৪৭তম অবস্থানে।