বৃষ্টিতে ম্যাচ পণ্ড, তবু সেমির আশায় বাংলাদেশ

কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ! বৃষ্টির কল্যাণে মুফতে দুটি পয়েন্ট নিয়ে শ্রীলঙ্কা এখন সেমিফাইনালের দাবিদার। অন্যদিকে গতকালের বৃষ্টির পর এখন ঝাপসা দৃষ্টিতে বিশ্বকাপ সেমির মঞ্চ হাতড়ে খুঁজতে হচ্ছে বাংলাদেশ দলকে।

প্রকাশ্যে এখনো সেমির আশা আনুষ্ঠানিকভাবে ছাড়েনি বাংলাদেশ। তবে সে লক্ষ্যে পৌঁছানো যে এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার মতো কঠিন হবে, তা বুঝে গেছেন সবাই। গতকাল বাংলাদেশ দলের কাউন্টি গ্রাউন্ডে রওনা হওয়ার কথা ৮টা ৪০ মিনিটে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে দুজন বাদে বাকিরা মাঠে গেছেন ১টায়। এর আগে লবিতে আড্ডায় সময় কাটিয়েছেন অনেকে। এঁদেরই একজন কাষ্ঠ হাসিতে রসিকতা করে বলছিলেন, ‘আমরা যদি পরের সব ম্যাচ জিতে সেমিতে উঠি, তাহলে আইসিসির উচিত হবে আমাদের কাপ দিয়ে দেওয়া। সেমিফাইনাল, ফাইনাল

কোনোটাই খেলার দরকার নেই!’

বাংলাদেশের সেমির অঙ্ক এখন এতটাই দুরূহ। টানা তিন ম্যাচ জিতে পয়েন্ট তালিকায় সবার ওপরে নিউজিল্যান্ড। তাতে ওদেরকে সেরা চারের চার্টে রাখছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। স্বাগতিক ইংল্যান্ড ও ভারতকে এবারের আসরের ফেভারিট মানছেন সবাই। দল দুটি খেলছেও দারুণ। তাই সেমিফাইনালের লাইনআপে বাকি থাকছে একটি স্পট। সেটির দাবিদার অবশ্যই অস্ট্রেলিয়া এবং বৃষ্টিতে ম্যাচ পণ্ড হওয়ার কারণে দুই পয়েন্ট পেয়ে যাওয়া শ্রীলঙ্কা। পয়েন্ট তালিকায় চার ও পাঁচ নম্বরে যে আছে এ দুটি দলই।

পয়েন্ট তালিকায় আপাতত বাংলাদেশের ওপরে আছে ওয়েস্ট ইন্ডিজও, যাদের সঙ্গেই পরের ম্যাচে মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। খেলা হবে টন্টনের যে মাঠে, সেখানে বিশেষজ্ঞরা ধরেই নিয়েছেন বল উড়ে উড়ে গিয়ে পড়বে স্টেডিয়ামের বাইরে! ম্যাচ পরিত্যক্ত ঘোষণার পর টিভি সাক্ষাৎকারে একই সম্ভাবনার কথা মাশরাফি বিন মর্তুজাকে বলছিলেন মাইক আথারটন। শুনে অবাক লাগছিল, বাংলাদেশ দলের মনে জমে থাকা একই আশঙ্কার কথা কী করে জানলেন সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক! মাশরাফি অবশ্য মনের চোরা গলিতে লুকিয়ে থাকা ভয়কে গোপন করেই বলেছেন, ‘হুম, ওদের দলে অনেক বিগ হিটার আছে। আমরাও সেভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছি। লক্ষ্য থাকবে আমাদের এক্সিকিউশন যেন ঠিকঠাক হয়।’

অথচ শ্রীলঙ্কার মতো ক্যারিবীয়রাও বাংলাদেশের ‘হিট লিস্টে’ আছে। বাংলাদেশ কোচ স্টিভ রোডস ক্যারিবীয়দের মারকাটারি ব্যাটিং এবং পাঁজর সোজা বোলিং নিয়ে ভয় না থাকার কথাই বলেছেন, ‘আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে ওদের খেলেছি।’ ধরে নেওয়া যাক, সে ধারাবাহিকতা টন্টনের ছোট মাঠেও অব্যাহত থাকবে। তাতে ৫ ম্যাচে ৫ পয়েন্ট হবে বাংলাদেশের।

তবু সেমিফাইনালের সম্ভাবনা জাগিয়ে রাখতে আরো তিনটি ম্যাচ জিততে হবে বাংলাদেশ দলকে। পরের ম্যাচের প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া, যে দলটাকে টুর্নামেন্ট শুরুর আগে সম্ভাব্য শিকারের তালিকায় রাখেনি বাংলাদেশ দল। কিন্তু গতকাল এক সিনিয়র ক্রিকেটার কানে কানে আশার বাণী শুনিয়েছেন, ‘দেখবেন, আমরা এই অস্ট্রেলিয়াকেই হারিয়ে দিয়েছি!’ সে রকম হলে ৬ ম্যাচে ৭ পয়েন্ট নিয়ে সেমির পথে বড় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বাংলাদেশের।

এ অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে ৭ নম্বর প্রতিপক্ষ আফগানিস্তানের উড়েই যাওয়ার কথা বাংলাদেশের সামনে! চার জয়ের তিনটি ওখানে হয়ে গেলে পরে ভারত ও পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের যেকোনো একটি জিতলেই সেমির স্বর্ণদুয়ার খুলে যাবে বাংলাদেশের সামনে। ৯ ম্যাচে ১১ পয়েন্ট এবারের বিশ্বকাপ সেমির বেঞ্চমার্ক মনে করা হচ্ছে যে!

এ সবই অবশ্য সম্ভাবনার কথা। গতকাল হোটেল লবিতে বসে সময় কাটানোর ফাঁকে দু’দান কাটাকুটি খেলার ছলে। তবে ক্রিকেট তো আর সম্ভাবনার পথ ধরে নিয়ম করে হাঁটে না। এর মোড়ে মোড়ে অনিশ্চয়তা। অপেক্ষাকৃত ছোট দলগুলোর জন্য যা আরো অনিশ্চিত। বিশেষ করে টানা ম্যাচ জয়ের পরিস্থিতি যখন সৃষ্টি হয়।

বাকি ছয় ম্যাচের মধ্যে অন্তত চারটি জয় তাই বিশ্বকাপপূর্ব মাশরাফি বিন মর্তুজাদের সেমিফাইনালে ওঠার স্বপ্নপূরণের চেয়েও কঠিনতর মনে হচ্ছে। অধিনায়ক নিজে বাস্তবতার কথা বলছেন বার বার, ‘আমাদের মতো দলের পক্ষে প্রতি ম্যাচে ভালো খেলা কঠিন, এটা সবাইকে বুঝতে হবে। বলছি না যে আমাদের পক্ষে অসম্ভব। ক্রিকেটে তো কত কিছুই সম্ভব। তবে এত বড় আসরে বড় বড় দলের বিপক্ষে প্রতিদিন জেতা খুব কঠিন।’

এ জন্যই শ্রীলঙ্কা ম্যাচ বৃষ্টিতে বাতিল হওয়ায় খুবই হতাশ বাংলাদেশ দল। গতকাল ম্যাচ হলে দুই পয়েন্ট পেতেই পারত বাংলাদেশ, অন্তত তীব্র আশাবাদ দেখা গেছে টুর্নামেন্ট শুরুর আগে থেকেই। ম্যাচ হলে যে ফল উল্টোও হতে পারত, সে রকম কোনো শঙ্কা দেখা যায়নি বাংলাদেশ দলে। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী দলটাই যখন মাঠ থেকে হোটেলে ফিরছিল ম্যাচ বাতিলের পর, তখন কেমন ন্যাতানো দেখাচ্ছিল। বুঝতে অসুবিধা হয়নি, পয়েন্ট খোয়ানোর হতাশাই এর কারণ।

‘শোকার্ত’ বিভিন্ন শহর থেকে খেলা দেখতে আসা প্রবাসী বাঙালিরাও। এ নিয়ে এবারের বিশ্বকাপের তিনটি ম্যাচ পরিত্যক্ত হলো, যা নতুন রেকর্ডও। এর আগে ১৯৯২ ও ২০০৩ সালে দুটি করে ম্যাচ বাতিল হয়েছিল বৃষ্টির কারণে। অথচ এবার টুর্নামেন্টের অর্ধেকটা না যেতেই রেকর্ড গড়ে বসেছে পণ্ড ম্যাচ। এ সপ্তাহের আবহাওয়ার যে পূর্বাভাস, তাতে আরো অন্তত গোটা দুয়েক ম্যাচের ভাগ্যে ‘পণ্ড’ লেখা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে!

তাতে আর কোন দলের যে কপাল পোড়ে! নিশ্চিতভাবে সে আগুনের আঁচ লাগবে আইসিসির গায়েও। কেন রিজার্ভ ডে রাখা হয়নি? স্থানীয়রা তো আরো উগ্র, ‘ইংল্যান্ডে কেন যে বিশ্বকাপ আয়োজন করে আইসিসি? এখানে তো গ্রীষ্ম মানেই যখন-তখন বৃষ্টি!