বাঙালি বিজ্ঞানীর গবেষণায় ক্যানসারের ওষুধ আবিষ্কার

কথিত আছে, মিশরের রানি ক্লিওপেট্রা নাকি বাথটাবে কালোজিরা দিয়ে গোসল সারতেন। আর এটিই তাকে এত সুন্দর এবং নীরোগ করে তুলেছিল। শুধু সৌন্দর্য নয় ওষুধি গুণ হিসেবে কালোজিরার নামডাক সেই প্রাচীনকাল থেকেই। মাথাব্যথা থেকে শুরু করে কৃমি, দাঁতব্যথা সব সারাতেই কালোজিরার প্রয়োজন পড়ত। এমনকি ধর্মেও কালোজিরার গুণের কথা এসেছে বেশ ভালোভাবেই। হযরত মুহাম্মদ (সা) এর বাণী থেকে জানা যায় মৃত্যু ছাড়া বাকি সব রোগ সারাতেই কাজে দেয় কালোজিরা। এবার মিলল সেই কথারই সত্যতা।

এটি প্রমাণ করছেন কলকাতার এক গবেষক ও তার সহযোগী বিজ্ঞানীরা। কালোজিরা থেকে ক্যানসারের ওষুধ তৈরি করার উপায় খুঁজে পেয়েছেন এই গবেষক দল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যানোটেকনোলজি বিভাগের বিজ্ঞানী ড. অর্ঘ্য অধিকারী নেতৃত্ব দিয়েছেন এই গবেষণায়। গবেষণাটিতে প্রমাণিত হয়েছে স্তন ও ফুসফুসের ক্যান্সার সারাতে পারে কালোজিরা থেকে তৈরি ওষুধ।

বর্তমানে পৃথিবীতে ক্যানসারের যে চিকিৎসা প্রচলিত আছে তা ক্যানসার সারানোর পাশাপাশি শরীরের অন্যান্য অঙ্গের ওপরও প্রভাব ফেলে। সাধারণত কোনো রোগীই আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আসতে পারে না। তবে এই জায়গাতেই আশার আলো ছড়াচ্ছে ন্যানোটেকনোলজি। অতিক্ষুদ্র কণাকে কাজে লাগিয়ে ক্যানসার সেলকে ধ্বংস করে দেওয়া হয় এই উপায়ে।

ড. অর্ঘ্য অধিকারী জানালেন, ‘ক্যানসার আক্রান্ত অঙ্গ বা কোষগুলোকে চিহ্নিত করে আমরা আগে ম্যাপিং করে ফেলি। এরপর ওষুধটি খাইয়ে দেওয়া হয়। আমাদের গবেষণার উল্লেখযোগ্য সাফল্য হলো, ক্যান্সারে আক্রান্ত ফুসফুস বা ওই টার্গেটে গিয়ে সরাসরি আঘাত করছে আমাদের ওষুধ। যে অঙ্গ বা কোষ সুস্থ, সেখানে নয়। ফলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। সবচয়ে বড় কথা, কালোজিরা থেকে পাওয়া থাইমোকুইনন ফুসফুসের ক্যানসার আক্রান্ত কোষের ওপর সফলভাবে কাজ করছে।’

তিনি আরও জানান শুধু রোগের তীব্রতা কমানো নয়, থার্ড স্টেজের ক্যানসারও প্রায় সারিয়ে তুলছে কালোজিরা নির্যাস থেকে তৈরি এই ওষুধ। এরইমধ্যে ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা করে সাফল্য এসেছে গবেষণায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সল্টলেক ক্যাম্পাসের সেন্টার ফর রিসার্চ ইন ন্যানোসায়েন্স অ্যান্ড ন্যানোটেকনোলজির গবেষণাগারেই এই সফল পরীক্ষাটি করেছেন। গবেষণায় সহকারী হিসেবে ছিলেন সৌরভ ভট্টাচার্য, মনীষা আহির, প্রিয়াঙ্কা উপাধ্যায়, মৌসুমী ভট্টাচার্য, শাশ্বতী দাস, সুস্মিতা সরকার ও অভিজিৎ ঘোষের মতো বিজ্ঞানীরা।

কালোজিরা থেকে তৈরি এই ওষুধকে দুইভাবে ব্যবহার করেছিলেন গবেষকরা। প্রথমবার নন টার্গেটেড, আর তারপর টার্গেটেড। প্রথমে কোন কোষ বা অঙ্গে গিয়ে ওষুধটি আঘাত করবে, তা তিনি ঠিক করে দেননি। সেই পরীক্ষাটি ছিল স্তন ক্যানসারের ওপর। তাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য মিলেছিল। ড. অধিকারী বলেন, ‘যেহেতু থাইমোকুইননের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই এবং এর থেকে পাওয়া ওষুধটি শুধুই ক্যানসার আক্রান্ত কোষকে নষ্ট করার জন্য তৈরি। তাই নন টার্গেটেড হওয়া সত্ত্বেও অসুবিধা হয়নি। ৮০ শতাংশ ওষুধই ক্ষতিগ্রস্ত কোষের ওপর কাজ করেছিল। তবে ফুসফুস ক্যানসারের ক্ষেত্রে গবেষণাটি টার্গেটেড হওয়ায় সাফল্যের মাত্রা আরও বেড়েছে।’

গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে ‘রয়্যাল সোস্যাইটি অব কেমিস্ট্রি’র বায়োমেটেরিয়াল সায়েন্স পত্রিকায়। থাইমোকুইনন থেকে পাওয়া ওষুধ সংক্রান্ত দুটি পেটেন্টও রয়েছে ড. অধিকারীর। ক্যানসার প্রতিরোধে এই গবেষণা একটি বড় মাইলফলক হতে চলেছে বলে মনে করছেন সুধী জনেরা।