মুখোমুখি হতেই চলল গুলি : ভাই পুলিশ, বোন মাওবাদী

ভারতে মাওবাদীদের অত্যাচার বেড়েই চলছে। মাওবাদী দলের সদস্য সংগ্রহ করা হয় গরিবদের জন্য ও অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই বলে। কিন্তু তাদের লক্ষ্য বদলেছে। শুধু মানুষ খুন করায় ব্যস্ত তারা। তাই ভারত সরকার তাদের ধরতে সরকারি নির্দেশিকা জারি করেছে। আর তাদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে দেশটির পুলিশ।

ভারতের ছত্তিশগড়ে মাওবাদীদের ধরার সংবাদ জানতে গিয়ে জানা গেল এক করুণ কাহিনি। জানা গেল দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের আপন বোনকে গুলি করেছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। এই ঘটনাটি ঘটে ২৯ জুলাই সকাল ৭টার দিকে। ছত্তিশগড়ের সুকমার পাহাড় ঘেরা ঘন জঙ্গলে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ওই জঙ্গলে মাওবাদীদের ঘাঁটি ঘিরে রাখে ছত্তিশগড় পুলিশের বিশেষ বাহিনী। গোপন আস্তানা থেকে উড়ে আসতে থাকে একটি দু’টি করে গুলি। পাল্টা জবাব দিচ্ছে পুলিশও। জলপাই রঙা পোশাক পরা এক নারী এই ঘাঁটির নেত্রী। কম্যান্ডোদের মূল লক্ষ্য তিনিই। তাকে ধরতে হবে। জীবন্ত অথবা মৃত।

মাওবাদীদের গুলির জবাব দিতে দিতে অনেকটা দূরে চলে গিয়েছিলেন ভেট্টি রামা। এই বিশেষ বাহিনীর তিনি ‘সিক্রেট ট্রুপার।’ অবর্থ্য তার নিশানা। বন্দুকটা শক্ত করে ধরে য়খনই গুলি চালাতে যাবেন, তখনই চোখ পড়ল ওই নারীর ওপর। সাহসী মাওবাদী নেত্রী ভেট্টি কান্নি। নিষ্পলকে রামার দিকেই তাকিয়ে কান্নি। রামার চোখে জল। সামনে যিনি দাঁড়িয়ে, তার সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক রামার। অনেক দিন পরে  দিদির সঙ্গেই যে দেখা হল তার! এক মুহূর্তের আবেগ। পরক্ষণেই গর্জে উঠল কান্নির রাইফেল। গুলি চালালেন রামাও। একটা গুলি লাগল কি দিদির গায়ে?  ফিনকি দিয়ে ছিটকে এল রক্ত। ছুটে গেলেন রামা। ততক্ষণে কান্নি উধাও। সেই জায়গায় পড়ে চাপ চাপ রক্ত।

জানা যায়, ভেট্টি কান্নি ও ভেট্টি রামা একসময় মাওবাদী দলের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। কান্নির এখন ৫০ বছর, রামার ৪৩। বাস্তার এলাকায় ছিল তাদের ঘাঁটি। তেলঙ্গানার সীমান্ত পেরিয়ে কোন্টা হয়ে মাওবাদীরা তখন সক্রিয় বাস্তার ও তার সংলগ্ন গ্রামগুলোতে। প্রায় ১১৬টি গ্রাম দখল করে রেখেছে মাও বাহিনী।

ভেট্টি রামা জানান, ১৯৯০ সাল নাগাদ তিনি ও তার দিদি কান্নি মাওবাদী দলে নাম লেখান। দু’জনেরই বয়স তখন খুব কম। তাদের গ্রামের আরো কয়েকজনও মাওবাদী দলে নাম লিখিয়েছেন। তিনি বলেন, মাওবাদী দলের আমরা ছিলাম কনিষ্ঠ সদস্য। আমাদের বলা হয়েছিল এই লড়াই গরিবদের জন্য। অবিচারের বিরুদ্ধে। তবে এখন মাও দলে বদল এসেছে। তাদের লক্ষ্য বদলেছে। যখন বুঝতে পারি শুধু মানুষ খুন করা হচ্ছে, তখনই আত্মসমর্পণ করি আমি।

পরে ২০১৮ সালের দিকে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন রামা। রামা জানান, দিদি কান্নিকে বলা সত্ত্বেও ধরা দিতে নারাজ ছিলেন। উল্টা দলের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিলেন সুকমার গভীর জঙ্গলে। আত্মসমর্পণের পরে রামা যোগ দেন ছত্তিশগড় পুলিশের বিশেষ বাহিনীতে। ‘সিক্রেট ট্রুপার’ হিসেবে কাজ শুরু করেন, পরে কনস্টেবল পদে নিয়োগ পান।

ছত্তিশগড়ের সাব-ডিভিশনাল অফিসার চন্দ্রেশ সিং ঠাকুর বলেন, রামা এবং কান্নি দু’জনেই মাওবাদীদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কম্যান্ডার। এক সময় রামার মাথার দাম ছিল সাড়ে ৬ লাখ টাকা। এখন তিনি পুলিশ, আর কান্নি মাওবাদীর সুকমা ঘাঁটির শীর্ষ নেত্রী। এর আগেও রামা অনেকবার চেষ্টা করেছিলেন কান্নিকে ফিরিয়ে আনতে। আত্মসমর্পণের অনুরোধ করে বার চিঠিও লিখেছিলেন। তবে তার উত্তর আসেনি। নিজের লক্ষ্য থেকে সরে আসতে রাজি হননি কান্নি।

ভেট্টি রামা বলেন, ভীষণ ভয়ঙ্কর মাওবাদীদের জীবন। বার বার আস্তানা বদল। প্রতি মুহূর্তে প্রাণ সংশয়ের আশঙ্কা। বাড়ির লোকের সঙ্গে যোগাযোগ ছিলো না সাত বছর। আমি চেয়েছিলাম এ থেকে মুক্তি। দিদিকেও ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি।

শরীরে গুলি লাগার পর মাওবাদীর ওই সাহসী নেত্রী বেঁচে আছেন কি না তার খবর পাওয়া যায়নি। পরবর্তী অভিযানের জন্য তৈরি হচ্ছেন রামা ও ছত্তিশগড়ে পুলিশের বিশেষ বাহিনী।

‘বোন আত্মসমর্পণ না করলে এ বার এনকাউন্টারে মৃত্যু। কিভাবে তাকে মারবো নিজের হাতে? এমনটা যেন না হয়, আমি চাই ও ফিরে আসুক,’ চোখের জল মুছে মুছে বলেন ‘সিক্রেট ট্রুপার’ রামা।

সূত্র: দ্য ওয়াল।