স্ত্রী সন্তানের স্বীকৃতি দিয়ে ১৮ বছর পর মুক্ত ইসলাম

স্ত্রী ও সন্তানের স্বীকৃতি দিয়ে ১৮ বছর কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন মোহাম্মদ ইসলাম। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় তার যাবজ্জীবন সাজা হয়েছিল। ইসলাম ঝিনাইদহ সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের আবদুল আজিজ মৃধার ছেলে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে তিনি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান। ওই সময় কারাফটকে উপস্থিত ছিলেন ইসলামের বাবা, দুই বোন ও এক ভাই।

তবে ইসলামের ছেলে মিলন ও স্ত্রী মালা উপস্থিত ছিলেন না। তাদের আশায় ছিলেন কারা কর্মকর্তাসহ স্থানীয় সাংবাদিকরা। তাদের না থাকার বিষয়ে ইসলামের বাবা আবদুল আজিজ বলেন, ‘তারা ঢাকায় রয়েছে। সেখান থেকে বাড়িতে আসবে।’

যশোর কারাগারের জেলার আবু তালেব বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশে ১৪ বছর ৬ মাস ২৯ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেলেন ইসলাম। তার সাজা হয়েছিল ৩০ বছরের। সন্তান ও স্ত্রীকে মেনে নেওয়ার শর্তসাপেক্ষে আদালত তার জামিন আবেদন মঞ্জুর করেছে। এর আগে যশোর কারাগারে তাদের ফের বিয়ে দেওয়া হয় গত ৩১ জুলাই। এরপর ঝিনাইদহ কারাগারে ইসলামের জামিন আদেশ পৌঁছালে সেখান থেকে যশোর কারাগারে পাঠানো হয়। সে অনুযায়ী গতকাল তাকে মুক্তি দেওয়া হলো।

ছেলেকে নিতে কারাফটকে আসা ইসলামের বাবা আবদুল আজিজ কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ছেলেকে মুক্ত করতে পেরে তিনি অনেক খুশি। ইসলামের ছেলেকে তারা অনেক আগেই মেনে নিয়েছেন। তিনি পুত্রবধূ মালার পরিবারকে দায়ী করে বলেন, ‘তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে এত কিছু হতো না।’

মিলন তার বাবাকে কেন নিতে আসেনি জানতে চাইলে আজিজ বলেন, ‘সে তার মায়ের সঙ্গে ঢাকায় রয়েছে। তারা ঢাকা থেকে বাড়িতে আসবে।’ জামিনে কারামুক্ত ইসলাম বলেন, তিনি খুব খুশি। সন্তান পরিবারসহ তিনি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চান।

গতকাল দুপুর আড়াইটার দিকে ইসলাম তার বাবা ও ভাই-বোনদের সঙ্গে ঝিনাইদহের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন।

২০০০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ইসলাম প্রেম করে একই গ্রামের (লক্ষ্মীপুর) মালাকে বিয়ে করেন। কিন্তু সাহস করে বাড়িতে নিতে পারেননি। একপর্যায়ে মালা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে ইসলাম তাকে স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চাননি। গর্ভের সন্তানের পিতৃপরিচয়ের দাবি নিয়ে মালা ইসলামের বাড়ি গেলে তাকে বের করে দেওয়া হয়। ২০০১ সালের ২১ জানুয়ারি ছেলেসন্তানের জন্ম দেন মালা। নাম রাখেন মিলন। মিলন ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর মালার বাবা বাদী হয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে ২০০১ সালে ধর্ষণের একটি মামলা করেন ঝিনাইদহ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। আদালতের নির্দেশে পুলিশ ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু ইসলাম আদালতেও মালা ও তার সন্তানকে অস্বীকার করেন। ওই সময় মালার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ছেলে মিলনের ডিএনএ টেস্ট করা হলে তার পিতৃপরিচয় নিশ্চিত হয়। ২০০১ সাল থেকে ধরলে ইসলাম কারাগারে ছিলেন ১৮ বছর।

আদালত ওই মামলায় ইসলামকে দোষী সাব্যস্ত  করে ২০০৫ সালের ১৩ জানুয়ারি ৩০ বছর কারাদণ্ড, এক হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে ইসলাম আপিল করলে রায় বহাল রাখে উচ্চ আদালত। উচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করলে সেখানেও ইসলামের সাজার রায় বহাল থাকে। পরে আপিল রিভিউ আবেদন করেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ইসলাম। ইসলামের করা রিভিউ শুনানিতে আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির বেঞ্চে মালা ও মিলনের স্বীকৃতির বিষয়টি সামনে আনেন। তিনি তখন বলেন, বর্তমানে ইসলাম মালাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতে চান। মিলনকে সন্তানের স্বীকৃতি দিয়ে স্ত্রী ও সন্তানকে তিনি নিজ বাড়িতে তুলে নিতে চান।

ইসলামের আইনজীবীর এই বক্তব্য শোনার পর প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এক আদেশে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্র্তৃপক্ষকে কারাভ্যন্তরে ইসলাম ও মালার আবারও বিয়ে পড়ানোর নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলারকে ২৯ আগস্ট এ বিষয়ে অগ্রগতি জানাতে নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আবু তালেব বলেন, আদালতের নির্দেশে জেলা প্রশাসকের অনুমতিক্রমে ৩১ জুলাই কেন্দ্রীয় কারাগারের ভারপ্রাপ্ত সুপার, দুই পক্ষের আত্মীয়স্বজন ও তাদের ছেলে মিলনের উপস্থিতিতে ইসলাম ও মালার বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের কাবিন উচ্চ আদালতে জমা দেওয়ার পর ইসলামের জামিন আবেদন মঞ্জুর হয়।